দাম বেড়েছে সার তেল মজুরি ও বীজধানের
আমনের বীজতলা পরিচর্যা করছেন কৃষক মনিরুল ইসলাম। গত রোববার কুষ্টিয়া সদরের বটতৈল ইউনিয়নের ভাদালিয়া এলাকায় সমকাল
সাজ্জাদ রানা, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে আসন্ন মৌসুমে আমন ধানের আবাদের লক্ষ্য ষাটোর্ধ্ব মনিরুল ইসলামের। এ জন্য কুষ্টিয়া সদরের বটতৈল ইউনিয়নের ভাদালিয়ায় জমিও প্রস্তুত করেছেন। ছেলেকে নিয়ে যত্ন
নিচ্ছেন বীজতলার। গত বোরো মৌসুমে বিপুল লোকসান হলেও আমন আবাদে নামছেন নতুন
আশা নিয়ে। ১৫ দিনের মধ্যেই সব জমিতে চারা রোপণের আশা মনিরুলের। কিন্তু সার, তেলের বাড়তি দাম ও শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে তাঁর মনে দুশ্চিন্তা ভর করেছে।
মনিরুল ইসলাম গত রোববার বলেন, ‘এখন তেল ও সারের দাম বাড়তি। শ্রমিকের মজুরি আগের থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে এবার ধানের বীজের দামও বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি ধানবীজ শতকরা ১০ ভাগ দাম বেড়েছে। এ জন্য কৃষকের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।’
এসব সংকটের মধ্যে ধান আবাদ করে দাম পাওয়া নিয়ে চিন্তায় কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃষকরা। আর কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সরকারি প্রণোদনাও কমেছে। আমন চাষ করে যদি কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হন, তবে সার্বিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা কৃষি বিশ্লেষকদের।
বীজ মার্কেটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিএডিসি উৎপাদিত প্রতিটি জাতের বীজের দাম গত আমন মৌসুমের তুলনায় প্রায় ১০০ টাকা বেশি। অন্য বেসরকারি বীজের দাম আরও বেশি।
কুমারখালী উপজেলার নন্দালালপুর গ্রামের কৃষক রিপন হোসেন গত বুধবার বলেন, একদিকে সারের সংকট চলছে, অন্যদিকে তেলের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। এবার আবার সব ধরনের ধানের বীজের দামই বাড়তি। ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত বীজের। এতে খরচের হিসেবে বাড়তি টাকা যোগ হচ্ছে।
কয়েকমাস আগে রিপন হোসেন আউশ আবাদ করেছিলেন কয়েক বিঘা জমিতে। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল এক লাখ টাকা। অথচ ধান বিক্রি করে বাড়িতে ফিরেছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। প্রতি মণ কাঁচা ধান মাত্র ৮৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন। রিপন বলেন, ‘২৫ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করতে আমার খরচ হবে প্রায় তিন লাখ টাকা। ধানের বীজ কিনতে এবার বেশি খরচ হয়েছে। তার ওপর প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দাম না দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যদি ধানের দাম না পাওয়া যায় তাহলে আমার মতো শত শত কৃষক লোকসানে পড়বেন। সরকারি প্রণোদনা কমায় কৃষকরা এবার সহযোগিতাও কম পেয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলা করে আবাদ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
অন্য কৃষকরা বলছেন, সরকারি প্রণোদনা কমায় চাপ এবার বাড়ছে খোলা বাজারে। এতে করে ধান উৎপাদনে যে টাকা খরচ হচ্ছে তার থেকে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে তাদের পুঁজিতে টান পড়ে দেনা বাড়ছে।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে মোড়ের বীজ ব্যবসায়ী জেড এম সাঈদী সাগর বলেন, এবার আমন বীজের বিক্রি অন্যবারের তুলনায় অর্ধেক। বিক্রি কমায় সাধারণ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্থ। ফসলের দাম না থাকায় এবার আবাদ কমেছে বলে ধারণা তাঁর।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের ক্ষতি পোষাতে সার-বীজ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। তবে অন্যবারের তুলনায় পরিমাণ কমেছে। গত বছর সদর উপজেলায় তিন হাজার ৩০০ কৃষক আমনে প্রণোদনা পেয়েছিলেন। এবার পাচ্ছেন মাত্র দুই হাজার ৭০০ জন। একই চিত্র পুরো জেলায়।
কৃষি বিশ্লেষক মোহাম্মদ জাবির হুসাইন বলেন, ধানের বাজার কম হলেও চালের দাম চড়া। এতে মুনাফা লুটছেন ফড়িয়া আর মিল মালিকরা। কৃষকের লোকসান ঠেকাতে অবৈধ সিন্ডিকেটের লাগাম টানার পাশাপাশি প্রণোদনা বাড়াতে হবে। সঙ্গে স্থায়ী বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। তিনি মনে করেন, চাল আমদানির আগে দেশের মজুত নিয়ে সঠিক হিসাব কষতে হবে। যখন-তখন চাল আনা যাবে না। তাহলে কৃষক আর ঠকবেন না।
জেলায় গত বছর আমন ধানের আবাদ হয়েছিল প্রায় লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে। চলতি বছরও প্রায় একই পরিমাণ জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। এসব বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. শওকত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, কৃষকের লোকসান কমাতে সরকারি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সার-বীজ দেওয়া হচ্ছে। তবে ধানের বাজার কম থাকায় তাদের কিছুটা লোকসান হচ্ছে।
- বিষয় :
- বীজ