ভেদরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
সেবা নিতে এসে ধসের আতঙ্কে থাকেন রোগীরা
আশিকুর রহমান হৃদয়, ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর)
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২২
সাত বছরের আয়েশার কানে সমস্যা। শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখানোর জন্য তাঁকে নিয়ে গতকাল রোববার সকালে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন চাচা আশরাফুল হক সজিব মাঝি। উপজেলা পরিষদের পাশেই তাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসা রয়েছে। ঘণ্টাখানেক চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষার ছিলেন সজিব। বারবার তাকাচ্ছিলেন ফাটল ধরা ছাদের দিকে। তাঁর মনে আতঙ্ক, কখন জানি ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে।
রোগীদের এই আতঙ্কের কারণ একটাই। গত ২২ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অফিসকক্ষের ভেতরে ধসে পড়ে ছাদের পলেস্তারা। এ সময় কর্তব্যরত একজন নার্স অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতাল ভবনের প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলায় ছাদের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল। প্রায়ই এসব জায়গা থেকে পলেস্তারা ও সুরকি খসে পড়ছে। রোগীরা এসব জায়গা এড়িয়ে চলছেন। যখন বাধ্য হয়ে ওই স্থান ব্যবহার করছেন, তখন তাড়াহুড়ো করছেন। শুধু রোগীরাই নন, আতঙ্কিত হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীর স্বজনেরাও।
১৯৭২ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৯৮৪ সালে নির্মিত হয় দ্বিতল ভবন। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও ৩১ শয্যার লোকবল দিয়েই এখানে চলছে স্বাস্থ্যসেবা দান। ভেদরগঞ্জ ও সখিপুর থানা নিয়ে গঠিত এই উপজেলার জনসংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৩৫ জন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন এখানে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ আসেন চিকিৎসার জন্য। হাসপাতালে চিকিৎসকের ৪৫টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ২০ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা ১৭৩ জন, বিপরীতে আছেন ১১৩ জন। এখানে রয়েছে নার্সের সংকটও। এমনকি অ্যানেসথেশিয়ার চিকিৎসক না থাকায় সিজারিয়ান অপারেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এক্স-রে মেশিনসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামও নেই। জরাজীর্ণ পুরোনো ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন স্থাস্থ্যকর্মীরা। জরুরি রোগী স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্সও চালু নেই চালক না থাকায়।
গতকাল দেখা গেছে, হাসপাতালে সেবা নিতে আসা শত শত রোগীর ভিড়। অনেকে বেঞ্চে বসে আছেন, অনেকে জায়গা না পেয়ে মেঝেতেই বসে পড়েছেন। ফাটল দেখা গেছে জরুরি বিভাগ, চিকিৎসকদের বিশ্রামাগার, রোগীদের থাকার দুটি ওয়ার্ডের ছাদেও।
সখিপুর ইউনিয়নের বেপারিকান্দি এলাকার বাসিন্দা রুনা বেগমের (৪০) ৫ বছরের মেয়ের ডায়রিয়া। তাকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে আছেন রুনা। গতকাল সকালে তিনি বলেন, ‘মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছি চার দিন ধরে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলা থেকে নেমে মেয়ের ওষুধ আনার জন্য বাইরে যাচ্ছিলাম। হাঁটছি আর আতঙ্ক নিয়ে বারবার ছাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার পরই ছাদের ফাটলের স্থান। মাঝে মধ্যেই সিমেন্ট-সুরকির বড় বড় অংশ ধসে পড়ছে। এই জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় ভয় লাগে। এভাবে একটি হাসপাতালে থাকা যায় না।’ ভয়ে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিপন মিয়া (৪৫)। তাঁর বাড়ি রামভদ্রপুর ইউনিয়নের ভাটিতা গ্রামে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে শিপন মিয়া বলেন, ‘হাসপাতালে মানুষ আসে সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু এই হাসপাতালে এসে থাকি আতঙ্কে। কোন সময় যেন মাথায় ভেঙে পড়ে ছাদ। হাসপাতালের অনেক জায়গায় ছাদের অংশ ভেঙে পড়ছে। আবার হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য নাই কোনো মেশিন।’ তিনি পর্যাপ্ত মেশিন ও ভবন সংস্কারে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পেটের পীড়ায় ভুগে গতকাল দুপুরে জরুরি বিভাগে এসেছিলেন তারাবুনিয়ার রাসেল শিকদার (২৭)। তিনি বলেন, ‘যখন ডাক্তারের রুমে চিকিৎসা নিতে যাই, তখন দেখি ছাদের ওপর থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি ইটের ভাঙা অংশ নিচে পড়ছে।’
ভেদরগঞ্জ পৌরসভার গৈড্যা এলাকার বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘এখানে জ্বরের চিকিৎসা নিতে এলেও ভয়ে থাকতে হয়। চিকিৎসক কম থাকায় দীর্ঘ সময় লাইনে থাকতে হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকার পরও আমরা বঞ্চিত। শুধু জ্বর ও সর্দির ওষুধ পাই। তাই সরকারের কাছে দাবি, দ্রুতই ভবন সংস্কার অথবা নতুন ভবন করে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক।’
নানা সংকটের মধ্যেও রোগীদের চিকিৎসার চেষ্টা করছেন বলে জানান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল। প্রথম তলা ও দ্বিতীয় তলার ছাদেও ফাটল আছে। পলেস্তারা, ইটের সুরকি ও সিমেন্ট বালুর মিশ্রণ প্রায়ই খসে খসে পড়ছে। কর্তব্যরত আনসারদের মাধ্যমে তারা জনসাধারণকে সতর্ক করে আসছেন। চিকিৎসকরা সেবা দেওয়ার সময়ও ধসের আতঙ্কে থাকেন। এতে সেবা কিছুটা ব্যাহত হয় বলেও মন্তব্য করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলামের ভাষ্য, ‘হাসপাতালে মেশিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও চিকিৎসক, নার্সসহ জনবলের সংকট রয়েছে। আমরা সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় আপাতত সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া ড্রাইভার না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ আছে।’ হাসপাতালের পলেস্তারা খসে পড়ায় রোগী ও চিকিৎসক সবাই আতঙ্কিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি এসব জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। শিগগিরই কার্যকর উদ্যোগের আশা করছেন।
- বিষয় :
- শরীয়তপুর