পাউবোর গাফিলতিতে ১৫ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকার জলকদর খালের পানি নিষ্কাশনে পোল্ডার ৬৪-১ক-তে একটি রেগুলেটর বা স্লুইসগেট রয়েছে। দশমিক ৪৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও দশমিক ৬০ মিটার উচ্চতার রেগুলেটরটি বর্তমানে পর্যাপ্ত ও দ্রুত পানি নিষ্কাশন করতে পারে না। চার বছর উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা শেষে ২০২২ সালে রেগুলেটরটি ১.৫০×১.৮০ মিটারের আদর্শ মাপে উন্নত করতে সুপারিশ করা হয়।
একই পোল্ডারের ৩ নম্বর শাখা খালে দশমিক ৬×দশমিক ৭৬ মিটারের একটি রেগুলেটর রয়েছে, যেটি পরিবর্তন করে ১.৫০×১.৮০ মিটারের আদর্শ মাপে উন্নত করতে বলা হয়। একইভাবে চার নম্বর শাখা খালে এল দশমিক ৫৯×দশমিক ৭৫ মিটারের রেগুলেটরটিকে ১.৫০×১.৮০ মিটারের আদর্শ মাপে উন্নত করতে বলা হয়।
রেগুলেটরগুলো প্রায় তিন যুগ আগে স্থাপন করা। বর্তমানে বর্ষায় পানির উচ্চতা অনেক বেশি বাড়ায় এই রেগুলেটরগুলো দিয়ে সেই পানি নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না। তাই চার বছর গবেষণা শেষে প্রতিবেদনে ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের জলকদর খাল ও সাঙ্গু নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকা রেগুলেটরগুলো পরিবর্তন করে অধিক দৈর্ঘ্য ও উচ্চতার রেগুলেটর স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। নিজস্ব গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশ গত চার বছরেও বাস্তবায়ন করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বাঁশখালী উপকূলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৮৯টি রেগুলেটরের মধ্যে অকার্যকর ৫০টির পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে। ছিল বন্যার আগাম সর্তকবার্তাও। জলবায়ু পরিবর্তন হওয়ায় আগের দশমিক ৮১ থেকে ১ দশমিক ২২ মিটার সাইজের রেগুলেটরের নকশা পরিবর্তন করে ১.৫০ থেকে ১.৮০ মিটারের রেগুলেটর স্থাপনে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে। ৫০টি পুরোনো রেগুলেটরের মধ্যে পানি নিষ্কাশনে অকার্যকর দশমিক ৫০ থেকে ১ মিটারের রেগুলেটর রয়েছে সাতটি, দশমিক ৫০ থেকে ১.২০ মিটারের রয়েছে ১৯টি এবং বাকি ২৪টি দশমিক ৫০ থেকে ১.৫০ মিটারের। রেগুলেটরগুলোর ৪৯টি জলকদর খাল ও একটি সাঙ্গু নদীর সঙ্গে যুক্ত। ক্রটিপূর্ণ এসব রেগুলেটর দিয়ে এখন দ্রুত সাগরে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই গবেষণায় করা সুপারিশের ফাইল চাপা পড়ে রয়েছে।
এদিকে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায় এ বছর ভয়াবহ বন্যার পেছনে অকার্যকর রেগুলেটরগুলোকে অনেকটা দায়ী করেছেন পাউবো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম অঞ্চল) সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শিবেন্দু খাস্তগীর। শিবেন্দু খাস্তগীর বলেন, বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায় বন্যার জন্য ছোট ছোট রেগুলেটর অনেকটা দায়ী, যেগুলোতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয় না। রেগুলেটরগুলোর মুখে সারা বছর ধরে পলি জমে পানি অপসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারি পৃথক বাজেট না থাকায় রেগুলেটরগুলোর মুখে জমে থাকা পলি অপসারণ করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, কোনো গবেষণা প্রতিবেদন জমার পর একটি ডিপিপি তৈরি করতে গিয়ে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় দুই থেকে তিন বছর সময় চলে যায়। দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করা সম্ভব হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পাউবো ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের বাঁশখালীসহ দেশের পাঁচটি উপকূলীয় অঞ্চলে ‘উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, পর্যায়-১’-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও বিশ্লেষণ জরিপ পরিচালনা করে। এর নেতৃত্ব দেন পাউবোর তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ হাসান ইমাম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জলকদর খাল ও এর সঙ্গে যুক্ত অভ্যন্তরীণ খালের পানিপ্রবাহের সক্ষমতা অপর্যাপ্ত। এখানে থাকা রেগুলেটরগুলোর নিষ্কাশন ক্ষমতা অপ্রতুল। বর্তমান ভৌত কাঠামো ২০৫০ সালের জলবায়ু পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নয়।
জানতে চাইলে সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, কিছু দিন আগে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বড় একটি প্রকল্প নেওয়ার বিষয় নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। সেখানে উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ুর প্রভাব উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পাউবো-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, বাঁশখালীর পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্ব-পশ্চিম পাশে জলকদর খাল। এই খাল উভয় পোল্ডারের জন্যই নিষ্কাশন পথ। সম্প্রতি রেকর্ড বৃষ্টির কারণে রেগুলেটরের সক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি জমে যায়; যার কারণে পানি নামতে সময় নেয়। ভবিষ্যতে যাতে দ্রুত সময়ে পানি নিষ্কাশন হয় সে জন্য ২০২২ সালের স্টাডির আলোকে নতুন করে রেগুলেটরগুলো তৈরি করতে ডিপিপি তৈরির কাজ শুরু করেছি। খুব শিগগির এটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।
প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি ডিপিপি তৈরি করেছিলাম। ২০২৪ সালে ৮৭৪ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রকল্পে এই ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে নেওয়া রেগুলেটর সংযোজন বিয়োজনের প্রস্তাব ছিল। সরকার তা বাদ দেওয়ায় এত দিন কাজ করা সম্ভব হয়নি।
- বিষয় :
- পাউবো