ড্যাব নেতার ফোনালাপ ঘিরে উত্তেজনা, আতঙ্ক
ছবি: ফাইল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:১৯ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ২২:৪৫
ময়মনসিংহে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের নেতা ডা. বদরউদ্দিন সোহেলের সঙ্গে সাবেক ছাত্রদল নেতা ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ সিয়ামের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় তোলপাড়া শুরু হয়েছে।
ফোনালাপে ড্যাব নেতাকে নিজ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গালাগাল, কেন্দ্রীয় নেতাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং জুনিয়র চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দিতে শোনা যায়। এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকদের রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ডা. সোহেল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সভাপতি।
ফাঁস হওয়া কথোপকথনে ড্যাবের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও নেতৃত্বের কোন্দল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অডিওতে শোনা যায়, ডা. সোহেল তাঁর আর্থিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে শুরুতেই বলেন, ‘আমার তো ভাই কইরা খাইতে হইব।’ এরপর অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে নিজের আধিপত্য জাহিরের চেষ্টা করেন। ড্যাবের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সায়েমের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি তাঁকে ‘বলদ’ আখ্যা দেন এবং নিজেকে অনেক বড় নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।
এমনকি ড্যাবের কেন্দ্রীয় প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে ‘ডোনার মিঞা’ এবং বর্তমান সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেনের প্রসঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, ‘এখন আমার না হইলেও চলে।’
স্থানীয় অন্য নেতাদের সাইজ করার প্রসঙ্গে নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ডা. সোহেল জানান, ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়ার প্রথম দিনই তিনি ডা. ফারুকের কমিটি বাতিল করেছেন এবং জমা দেওয়া ‘এক্সামিনার তালিকা’ থেকে অধ্যাপক ডা. শোয়েবসহ অনেকের নাম কেটে দিয়েছেন।
সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান ডা. জাকির হোসেন জিকুর প্রসঙ্গ উঠতেই ডা. সোহেল অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেন। ড্যাবের অন্যান্য বলয়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘তোমার মতো এমন… মাল তো আমি দেখি নাই...। তুমি একটা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমি যেই দুই দিন থাকি নাই দুই দিন তো তুমি প্রেসিডেন্ট। তুমি সেটা ব্যবহার না কইরা পাঁচ-ছয় বছরের জুনিয়রের পিছনে ঘুরো।’
ফাঁস হওয়া রেকর্ডিংয়ে ডা. জিকুর শিক্ষকতা ও পদোন্নতি আটকে রেখে তাঁকে কোণঠাসা করার কথা অকপটে স্বীকার করেন ডা. সোহেল। তিনি বলেন, ‘তুমি হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হইয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, লজ্জা করে না? সিনিয়রিটি, টিচারশিপ– এখানে নেতা হইতে গেলে তোমার শিক্ষকতা থাকবে না...। আল্লাহ আল্লাহ করে দোয়া করও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি অর্ডার হয়ে যায়। তারপর একটা অ্যাপ্লিকেশন দিবা, আমি বুঝব তোমারে প্রফেসর কেমনে বানাইতে হয়।’ বর্তমানে ডা. জিকুকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সব কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে একঘরে করে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও চিকিৎসক নেতার মুখে এমন ভাষা ও ক্যারিয়ার ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্তম্ভিত সাধারণ চিকিৎসকরা। ড্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ডা. জাকির হোসেন জিকু হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি আমাদের জ্যেষ্ঠ হয়েও কেন এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করলেন, তা মাথায় আসছে না। বিষয়টি শোনার পর থেকে খুবই খারাপ লাগছে।’
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল হাসান ফারুক জানান, ড্যাব সভাপতির এমন কুপরিকল্পনার কথা শুনে তারা সবাই শঙ্কিত। এখন যে কোনো সময় তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেন।
জানতে চাইলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও ড্যাব সভাপতি ডা. বদরউদ্দিন সোহেল ফোনালাপের সত্যতা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, সাবেক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে তাঁর কিছু বিষয়ে কথা হয়েছিল। কথাগুলো ভুলবশত বাইরে চলে গেছে। তবে ফাঁস হওয়া বক্তব্যের বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চান না।
ডা. সোহেল পদে থাকার অযোগ্যতা উল্লেখ করে ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মাহমুদ ইসহাক বলেন, তিনি দলীয় সহকর্মীদের গালাগাল করার পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য তিনি উঠেপড়ে লেগেছেন। দ্রুত তাঁর কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার এবং বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।