ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কানমনা-হারাবতী খাল খনন

ভেকু দিয়ে কাজ করে বিলে শ্রমিকের নাম

ভেকু দিয়ে কাজ করে বিলে শ্রমিকের নাম
×

কালাই উপজেলার কানমনা-হারাবতী খাল খনন করা হলেও পারে রয়েছে আগাছা - সমকাল

শাহারুল আলম, জয়পুরহাট

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় কানমনা-হারাবতী খাল খননে ১৮০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী তাদের তালিকাও জমা দেওয়া হয়। বাস্তবে খননকাজে একজন শ্রমিকেরও পা পড়েনি ওই খালে!

সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে খননকাজের অন্তত ৫০ শতাংশ এলাকার হতদরিদ্র শ্রমিকের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত রয়েছে। তবে কানমনা-হারাবতী খাল খননে এ শর্ত পুরোপুরি উপেক্ষা করা 

হয়েছে। স্থানীয় হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করে ছয়টি এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে চালানো হয়েছে খননকাজ। তবে সেই কাজও নকশা অনুযায়ী করা হয়নি।
প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা না বাড়িয়ে কেবল পাড়ের ঘাস চেঁছে এবং আগাছা পরিষ্কার করে পুরো কাজ সম্পন্ন দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। চোখে পড়ার মতো খালে কোনো কাজ হয়নি বললেই চলে। সেই সঙ্গে সরকারি কোনো টেন্ডার বা প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই কেটে বিক্রি করা হয়েছে খালের দুই পাড়ের অসংখ্য মূল্যবান গাছ। প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য ছিল, স্থানীয় দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খালের সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর করা।

কালাই উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ এর আওতায় এক কোটি ৮২ লাখ টাকায় কানমনা-হারাবতী খাল পুনর্খনন প্রকল্পে সরকারি অর্থ লোপাটের এমন তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছে ‘কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে স্থানীয় একটি সমিতি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমিতির এক সদস্য এবং এলজিইডি কালাই কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কাগজে-কলমে কাজ দেখানো এবং ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পথ সুগম করতে ১৮০ জন ভুয়া শ্রমিকের তালিকা তৈরি করে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সচেঞ্জ) কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তালিকাটি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

প্রকল্পে শ্রমিকদের ব্যবহার না করার সত্যতা ও ভেকু দিয়ে কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তদারক কর্মকর্তা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর। তিনি বলেন, প্রকল্পে শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়নি এটা সত্য, পুরো কাজ ছয়টি ভেকু দিয়ে করা হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো ঠিক আছে। ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কানমনা-হারাবতী খালের রোয়াইর স্লুইসগেট থেকে বানদিঘি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনর্খননের জন্য প্রথম দফায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে একই খালের বাকি ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনর্খননের জন্য দ্বিতীয় দফায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই অর্থবছরে খননকাজ করেছে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি।

এই ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটারের মধ্যে কালাইয়ের সাঁতার গ্রামের হারাবতী খালের সংযোগ থেকে ইন্দাহার গ্রাম পর্যন্ত চার হাজার ৬৮০ মিটার (প্রাক্কলিত মূল্য ৫৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা)। আর বানদিঘি গ্রামের ব্রিজের অংশ থেকে গোবিন্দগঞ্জ সীমান্তবর্তী এক হাজার ২২৫ মিটার পর্যন্ত (প্রাক্কলিত মূল্য ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯২০ টাকা)। প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ১৫ মার্চ শুরু হয়ে ৩১ মে’র মধ্যে শেষ হয়।

এলজিইডির অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাটিং ডেপথ (গভীরতা) সর্বনিম্ন চার ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ২৪ ইঞ্চি। খালের তলার দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১১.৫ ফুট। উপরিভাগের দৈর্ঘ্য ২২ থেকে ৩২ ফুট। গভীরতা ৮.৫ থেকে ১১ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিন দেখা গেছে, নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই।

মাত্রাই মুন্নাপাড়ার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ইস্টিমেট অনুযায়ী কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খালের ভেতরে উঁচু হয়ে থাকা কিছু জায়গার মাটি কেবল তুলে দেওয়া হয়েছে। চারপাশ সমানভাবে খনন করা হয়নি। খালপাড়ের ঘাসগুলো শুধু চেঁছে দিয়ে ঢালু করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোনো টেন্ডার ছাড়াই পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। স্থানীয়রা বাধা দিলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে সবাই চুপচাপ দেখেছে কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করেনি।

মনোয়ার হোসেন নামে আরেকজন বলেন, কোটি টাকার প্রকল্প হলেও খালে কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। ছয়টি ভেকু দিয়ে কাজ করিয়ে গরিবের পেটে লাথি মারা হয়েছে। খালের গভীরতা বা চওড়া কিছুই বাড়ানো হয়নি। দায়সারা কাজ করায় প্রথম বর্ষাতেই মাটি ধসে খাল আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারের এতগুলো টাকা খরচ হলেও কৃষকরা কোনো সুফল পাচ্ছেন না। আমরা চাই, প্রকল্পের প্রতিটি অংশের কাজ নতুন করে মাপা হোক।

কয়েক দিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় খালের নিচু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, খালের মধ্যে পানি জমে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে মূল খননকাজ এড়িয়ে কেবল কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার করে পুরো কাজ শেষ দেখানোর পাঁয়তারা চলছে।

নকশার সঙ্গে কাজের মিল না থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও নকশা অনুসারেই কাজ করা হয়েছে। ভেকু ও শ্রমিকের সমন্বয়ে কাজ শেষ করা হয়েছে, এলাকাবাসীর অভিযোগ সত্য নয়।

কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, খাল খননের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছি। কাজ শেষ হওয়ার পর পোস্ট ওয়ার্ক মেজারমেন্ট অনুযায়ী কাজ মেপে বাকি বিল প্রদান করা হবে। কম কাটা হলে বিল কম দেওয়া হবে। তিনি বলেন, খাল খননে নিযুক্ত শ্রমিকের তালিকা এক্সচেঞ্জ অফিসে ফরোয়ার্ড করা হয়েছে, তাই সেটি আমাদের অফিসে সংরক্ষিত নেই।

আরও পড়ুন

×