ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নানা অপবাদ দিয়ে টাকা আদায় করে বখাটেরা

নানা অপবাদ দিয়ে টাকা আদায় করে বখাটেরা
×

ছবি-সংগৃহীত

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রী ও তরুণকে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপি নেতা নয়ন গোলদার। উপজেলার হাতিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিজ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। বখাটেদের নেতৃত্বে গড়ে তোলেন একটি বাহিনী। তারা গ্রামের নিরীহ মানুষের ওপর বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে ধরে আনতো এবং অত্যাচার করে আদায় করা হতো টাকা। সেই টাকার ভাগ পেতেন নয়ন গোলদারও।

গত রোববার ও গতকাল সোমবার সমকালের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ২৮ জুলাই দুপুরে বিদ্যালয়ের অদূরে একটি সেতুতে এক কলেজছাত্রের সঙ্গে কথা বলছিলেন অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী। কিছুক্ষণ পর দুজনকে ধরে নেওয়া হয় নয়ন গোলদারের বাড়িতে। সেখান থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এনে গাছে বেঁধে তাদের চড়থাপ্পড় দেওয়া হয়। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন কয়েকজন। পরে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে। পরদিন ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে মেয়েটি বিষপান করে। স্থানীয় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে সে সুস্থ হয়। 
এ ঘটনায় ছেলেটির বাবা গত রোববার রাতে কাশিয়ানী থানায় মামলা করেছেন। এতে আটজনের নাম উল্লেখসহ পাঁচ-ছয়জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন– নয়ন গোলদার (৪৫), সাগর রায় ওরফে সম্রাট (১৯), সনাতন সিকদার (২০), মিশন রায় (১৯), জিৎ বিশ্বাস (২০), অনিক মণ্ডল (১৯), জয় সিকদার (২২) ও চয়ন বিশ্বাস (২৩)। এদের মধ্যে নয়ন গোলদারকে রোববার ভোরে মাদারীপুর জেলার রাজৈর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অন্যরা গা-ঢাকা দিয়েছেন।

এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, যখন বিদ্যালয়ে ঘটনাটি ঘটে, তখন ক্লাস চলছিল। ক্লাস শেষে গিয়ে সে অল্প সময়ের জন্য ওই দুজনকে গাছের সঙ্গে বাঁধা দেখেছে সে। তখন অনেক লোক জড়ো হয়েছিল। ছেলে ও মেয়েকে প্রকাশ্যে অপমান করা হচ্ছিল। আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বখাটেদের ভয়ে এলাকার মানুষ ও শিক্ষকেরাও কথা বলতে সাহস পান না। তারা একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। বিচার হচ্ছে না। বিদ্যালয়ে আসতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
বিএনপি নেতা নয়ন গোলদারের বাড়ি হাতিয়াড়া ইউনিয়নের রাহুথড় গ্রামে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৫ আগস্টের পর নয়নের নেতৃত্বে সাগর রায় সম্রাট, মিশন রায়, সনাতন সিকদার, জিৎ বিশ্বাস, ভ্যানচালক অনিক মণ্ডল, জয় সিকদার, চয়ন বিশ্বাসসহ কয়েকজন ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে প্রেম, অনৈতিক সম্পর্কসহ নানা অপবাদ ছড়ায়। পরে বখাটে বাহিনী দিয়ে ধরে নির্যাতন করে টাকা রেখে ছেড়ে দেয়। মানইজ্জতের ভয়ে কেউ প্রতিবাদের সাহসও পান না।

ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরে। গত রোববার সন্ধ্যায় গিয়ে তার মা ও দাদিকে পাওয়া যায়। নিরাপত্তার শঙ্কায় সঙ্গে শুরুতে কথা বলতে রাজি হননি। মেয়েটির মা বলেন, তাঁর বাবার বাড়ি থেকে মেয়েটি পড়াশোনা করে। ঘটনার পর নানি গালাগালি করায় সে বিষপান করেছিল। এখন সুস্থ আছে। কিন্তু কোথায় আছে তা জানেন না।
এদিন ছেলেটির বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ছোট ভাইয়ের দাবি, তাঁর দাদা বাড়ির পাশে পাটের জাগ দিচ্ছিল। সেখান থেকে নয়ন গোলদারের লোকজন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধরে নিয়ে যায়। মেয়েটিকেও অটোরিকশা থেকে জোর করে নামানো হয়। দুজনকে নয়নের বাড়ি ও বিদ্যালয়ে নিয়ে মারধর করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এ যুগলকে ছাড়ার জন্য টাকা আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণের বাবা বলেন, ‘আমি সরাসরি জানি না। তবে শুনেছি, আমার খালাতো শালার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরে দরকষাকষি করে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে দেওয়া হয়।’
সহকারী পুলিশ সুপার (মুকসুদপুর সার্কেল) নাফিছুর রহমান বলেন, গত রোববার ভোরে নয়ন গোলদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তরুণের বাবা কাশিয়ানী থানায় মামলা করেন। এতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে নয়নকে গতকাল সোমবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজনের নাম জানা গেছে। 

আরও পড়ুন

×