ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিল দিয়েও ৯ বছর গ্যাস পান না গ্রাহক

বিল দিয়েও ৯ বছর  গ্যাস পান না গ্রাহক
×

পাশেই গ্যাসের চুলা। কিন্তু গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করছেন এক নারী। গত ২৬ জুলাই ধামরাইয়ের কালামপুরে

মোকলেছুর রহমান, ধামরাই (ঢাকা)

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘গত পাঁচ বছরে ৫০ দিনও গ্যাস পাইনি। প্রতি মাসেই সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে হচ্ছে। চুলা না জ্বালিয়েই প্রতি মাসে এক হাজার ৮০ টাকা করে গ্যাসের বিলও দিতে হচ্ছে। এমন গ্যাস লাইন আর চাই না। আর গ্যাস বিল দিবো না।’ ক্ষোভের সুরে কথাগুলো বললেন কাজিম উদ্দিন। ঢাকার ধামরাই উপজেলার কালামপুরের এই বাসিন্দা তিতাস গ্যাসের আবাসিক গ্রাহক। একই অভিযোগ উপজেলার এমন তিন হাজার গ্রাহকের। তারা বলছেন, নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসলেও গত ৯ বছর ধরে গ্যাস পাচ্ছেন না। কখনও মধ্যরাতে তাদের চুলায় অল্পস্বল্প গ্যাস আসে। কিন্তু এই গ্যাসে কোনো কাজই করা যায় না। 
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি ও গ্রাহকের কাছে পাওয়া তথ্যমতে, ধামরাই পৌরসভাসহ উপজেলায় আবাসিক গ্যাস সংযোগের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এর মধ্যে পৌর এলাকায় আছেন প্রায় তিন হাজার গ্রাহক। তারা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু কম হলেও গ্যাস পাচ্ছেন। কিন্তু কালামপুর, গোয়ালদী, কাশিপুর, বাটুলিয়া, সানোড়া, বাসনা, মহিশাষী, ধলকুন্ড, মধুডাঙ্গা, জালসা, কাওয়ালিপাড়া, নবগ্রাম, নান্দেশ্বরীসহ ২০-২৫টি গ্রামের আরও তিন হাজার গ্রাহক ২০১৭ সাল থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। শুধুমাত্র বছরে দুই ঈদের ছুটির সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে কয়েকদিন গ্যাস পান। সারাবছরই তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে লাকড়ির চুলা ও সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর। একই অবস্থা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও। 

কালামপুর বাজারের রেস্তোরাঁ মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, তাঁর বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে তাঁর খরচ বেড়ে গেছে চারগুণ। সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না করতে হচ্ছে।
গত ২৬ জুলাই উপজেলার কালামপুর গ্রামে কথা হয় গৃহবধূ নাছিমা আক্তারের সঙ্গে। লাইনে গ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করছিলেন তিনি। নাছিমা বলেন, গত ৯ বছর ধরেই লাইনের গ্যাস রান্নায় ব্যবহার করতে পারছেন না। শুধু ঈদের ছুটির সময় কয়েকদিন গ্যাস পান।

জানা গেছে, গত ৬ জুলাই গ্যাসের দাবিতে কালামপুর এলাকার সহস্রাধিক গ্রাহক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। পুলিশও বহু চেষ্টায় তাদের সরাতে পারেনি। পরে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিলে গ্রাহকরা অবরোধ তুলে নেন। 

কালামপুরের বাসিন্দা জানক আলীসহ কয়েকজনের দেওয়া তথ্যমতে, পাঁচ বছর আগেও মাঝেমধ্যে রাত ১২টার পর এক-দুই ঘণ্টার জন্য মিটমিট করে গ্যাস পাওয়া যেতো। যদিও এতে কিছুই রান্না করা যেতো না, উল্টো নষ্ট হতো। রান্নার জন্য তারা কাঠ, কেরোসিন ও লাকড়ির চুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। অধিকাংশ গ্রাহকই এখন বিল না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
একই গ্রামে বাড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি মির্জা ইয়ার হোসেনের। তিনি সমকালকে বলেন, ‘২০০৪ সালে আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে তিতাস গ্যাসের আবাসিক সংযোগ নেই। ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলেও গত ৯ বছর ধরে পাচ্ছি না।’ তিনিসহ কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ, কালামপুর ডিআরএস থেকে স্থানীয় করিম টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে মেশিন দিয়ে গ্যাস টেনে নিচ্ছে। ফলে আবাসিক প্রায় তিন হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে লাইনের গ্যাস পাচ্ছেন না। 
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন কালামপুর করিম টেক্সটাইলের কর্মকর্তা ফারুক আহম্মেদ। তিনি দাবি করেন, গত দুই বছর ধরে তারাও কোনো গ্যাস পাচ্ছেন না।

বাড়িমালিকেরা বিব্রত
গ্যাস না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন অনেক বাড়ির মালিক। ভাড়াটিয়ারা এসব এলাকায় থাকতে চাচ্ছেন না। আবুল হোসেন নামের এক বাড়িমালিকের ভাষ্য, অনেক ভাড়াটিয়াই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিচ্ছেন।
গ্রাহক ওয়াজ উদ্দিন মোগর বলেন, ‘ঢাকা ও মানিকগঞ্জের তিতাস গ্যাস অফিসে আমরা গ্রাহকদের গণস্বাক্ষর নিয়ে সমস্যা সমাধানে কয়েকবার আবেদন করেও প্রতিকার পাইনি। অথচ বছরের পর বছর গ্যাস না পেয়েও বিল দিতে হচ্ছে।’ 

ইউএনও মো. আল মামুন বলেন, গত ৬ জুলাই গ্রাহকেরা মহাসড়ক অবরোধ করলে গ্যাস সংকটের বিষয়টি জানতে পারেন। গ্যাস অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা বাড়ায় এখানে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। তারপরও আবাসিক গ্রাহকরা যাতে গ্যাস পান, সে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। 
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মানিকগঞ্জ অফিসের ডেপুটি ম্যানেজার বিধান পালের ভাষ্য, ‘গ্যাস সংকট এখন জাতীয় সমস্যা। মেইন পাইপলাইনেই গ্যাসের এ সংকট রয়েছে, আমরা পাব কোথা থেকে?’ তিনি স্বীকার করেন, ধামরাই পৌরসভা এলাকার গ্রাহকরা কম পরিমাণে গ্যাস পেলেও কালামপুরসহ আশপাশের গ্রামে একদম গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না। এ কারণে পাঁচ বছরের বিল মওকুফে গ্রাহকের দাবির বিষয়ে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। এটা সরকার যদি চায় তাহলেই সম্ভব।’

আরও পড়ুন

×