শরীয়তপুরে ভাইবোনসহ তরুণীকে বেঁধে নির্যাতন
রাজশাহী ব্যুরো ও ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
চোর সন্দেহে রাজশাহীতে গাছে বেঁধে দুই তরুণকে মারধর করায় এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করেছে দুর্বৃত্তরা। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর গৌরহাঙ্গা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে ছুরিকাঘাতের শিকার ব্যবসায়ী মাসুদ রানার স্ত্রী শ্যামলী খাতুন বাদী হয়ে গতকাল শুক্রবার নগরীর বোয়ালিয়া থানায় মামলা করেছেন। এদিকে শরীয়তপুরের সখিপুরে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এক তরুণী ও তাঁর ছোট ভাইবোনকে বেঁধে নির্যাতন এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবারের ঘটনার ভিডিও গত বৃহস্পতিবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগীর পরিবার অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।
ওয়ার্কশপে চুরির জের
রাজশাহীতে নির্যাতনের শিকার তরুণেরা হলেন- বোয়ালিয়া থানার জোলাপাড়া লাইনপাড়া মহল্লার মো. মিজান (২৫) ও ষষ্ঠীতলা এলাকার তন্ময় তেওয়ারী (২৫)। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নগরীর সায়েরগাছা এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানার মালিকানায় গৌরহাঙ্গা এলাকায় মাসুদ স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখান থেকে প্রায়ই লোহার জিনিসপত্র চুরি যায়। গত বৃহস্পতিবার রাতে দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাসুদ সন্দেহের বশে তন্ময়কে আটক করেন। এ সময় তন্ময় চুরিতে জড়িত হিসেবে মিজানের নাম জানান। পরে মিজানকেও ধরে আনা হয়। দুজনকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নির্যাতনের সময় গৌরহাঙ্গা এলাকার আল-আমিন ওরফে রিমন (২২) ও মো. শুভ (২৩) নামের দুজন মাসুদকে বাধা দেন। তাদের তর্কাতর্কির একপর্যায়ে রিমন পকেট থেকে চাকু বের করে মাসুদের পিঠে আঘাত করে পালিয়ে যায়। এলাকাবাসী থানায় খবর দিলে শিরোইল পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ঘটনাস্থল থেকে রিমন ও তন্ময়কে আটক করে। এ সময় শুভ ও মিজান পালিয়ে যান। পরে মাসুদ রানাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মাসুদের স্ত্রী গতকাল শুক্রবার মামলা করেন বলে জানান বোয়ালিয়া থানার ওসি মাছুমা মোস্তারি। তিনি বলেন, ছুরিকাঘাতের অভিযোগে দুজনকে পুলিশে দিয়ে মামলাটি করা হয়েছে। তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনজনকে নির্যাতন
শরীয়তপুরের সখিপুরে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক তরুণীকে (১৮) আটকে মারধর, শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাঁর বোন (১৩) ও ভাইকেও (৭) কয়েক ঘণ্টা বেঁধে নির্যাতন করা হয়। গত মঙ্গলবার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী শরীয়তউল্লাহ কলেজসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতেই ভুক্তভোগীদের মা সখিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
স্বজনেরা জানিয়েছেন, থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগ তুলে নিতে বিবাদীরা তাদের হুমকি দিচ্ছেন। নিরাপত্তাহীনতায় তারা বাড়ি ছেড়ে এক স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার নির্যাতনের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাংবাদিকেরা ভুক্তভোগীদের খোঁজে তাদের বাড়িতে যান। এ সময় তাদের পাওয়া যায়নি। ফোনে তথ্য পেয়ে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে অভিযোগের বাদী বলেন, ছৈয়ালকান্দি এলাকার মুদি দোকানদার মনির মোল্যা (২৫) দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মেয়েকে (১৭) কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। তিনি নিষেধ করাতে কিছুদিন চুপ ছিল। গত মঙ্গলবার সকালে তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে কেনাকাটার জন্য মনিরের দোকানে যায়। এ সময় বড় মেয়েকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। এর প্রতিবাদ করলে তিনজনকেই জোর করে দোকানের পাশের এক বাড়ির কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে। এ সময় এক কক্ষে ছোট ছেলে-মেয়েকে ও অপর কক্ষে বড় মেয়েকে রাখা হয়। মনির তাঁর বড় মেয়ের শরীরে জোর করে স্পর্শ করে। তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এলে চোর অপবাদ দিয়ে তিনজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। তাদের মারধর করে মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী তরুণীর ভাষ্য, তাঁকে পাশের রুমে নিয়ে কাপড় খুলে শরীরে স্পর্শ করে। চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে মনির বলে, তিনি নাকি চুরি করেছেন। পরে গাছে বেঁধে পিটিয়ে চুল কেটে দেয়। দুপুরে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী বলেন, ‘আমরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এসে দেখি মেয়েটার জামাকাপড় ছিড়াফারা, শরীরে ওড়না নেই। পরে দেখলাম তাঁকে গাছে বেঁধে মাথার চুল কেটে দিচ্ছে। দুই ভাই-বোনকে রশি দিয়ে পাশের ঘরে বেঁধে রাখছে। জানতে চাইলে মনির বলে, তারা নাকি চুরি করছে। কি চুরি করছে- সেটা বলে না। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়, এই চুরির অপবাদ মিথ্যা। এই মেয়েটাকে দীর্ঘদিন ধরে মনির ডিস্টার্ব করত, এটা আমরা দেখেছি।’
ভুক্তভোগীদের বাবা বলেন, ‘যেভাবে আমার সন্তানদের মারধর করা হয়েছে, এটা কোনো বাবা সহ্য করতে পারবে না। সকাল ৮টা থেকে
দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয়েছে। এই দেশে কি কোনো বিচার নেই? আমার
সন্তানদের মারধর করা হয়েছে। এখন উল্টো আমরাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অভিযোগ তুলে না নিলে যেখানে-সেখানে লাশ পড়ে থাকবে- এই ধরনের হুমকি দেয়।’
মনির মোল্লা বলেন, ‘মারধরের বিষয়টি মিথ্যা। তারা আমার দোকানে চুরি করেছে। তাই স্থানীয়রা তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। কয়েকজন তাঁর মাথার চুল কেটেছে। আমি জড়িত নই।’ কুপ্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
সখিপুর থানার ওসি মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- নির্যাতন