ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অসুস্থ দায়িত্বপ্রাপ্তও দেখেন না চোখে
যশোর অফিস
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন অসুস্থ, আরেকজন চোখে দেখতে পান না। যশোরের চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন এ দুই শিক্ষকের কাঁধেই। প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর ঐতিহ্যবাহী এই সরকারি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তৈরি হয়েছে গভীর সংকট।
চৌগাছা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে। আর সরকারীকরণ হয় ২০১৮ সালে। বিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান অবসরে যান ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর। এর পর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে ওঠে তাঁর জন্য। এর পরও এক বছরের বেশি সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন।
পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে গত বছরের শেষে বিদ্যালয়ের পাঁচজন অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, ‘দুর্ঘটনার পর শফিকুল ইসলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এমনকি তিনি স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারেন না। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবারের সদস্যদের সহায়তার প্রয়োজন হয়।’
অভিযোগের পর শফিকুল ইসলাম অসুস্থতাজনিত ছুটিতে যান। গত সাত মাস ধরে তিনি অর্ধেক বেতনে ছুটিতে রয়েছেন। এখন তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক থাকতেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এর পর আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক বিষয়ও এখন আমার কাছে নেই।’ শফিকুল ইসলামকে ছুটিতে পাঠানো হলেও বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব সংকটের সুরাহা হয়নি।
জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান সিনিয়র শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বাবু। কিন্তু তিনিও গুরুতর অসুস্থ। দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে ব্যক্তিগত
খরচে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করে বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করছেন। চলাফেরা থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজেও সহকর্মীদের সহায়তা নেন তিনি।
সাইদুল ইসলাম জানান, তিনি শুধু দায়িত্বের চেয়ার পেয়েছেন; প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব বুঝে পাননি। এমনকি অফিসের আলমারির চাবিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার শারীরিক অবস্থায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর একটি বিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, ‘প্রধান শিক্ষকসহ অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। সরকারীকরণের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ না থাকলেও সরকার থেকেও নতুন শিক্ষক দেওয়া হয়নি। অফিস সহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদও খালি রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’ আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রম ও শৃঙ্খলায়। সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে সকালের সমাবেশে উপস্থিত ছিল মাত্র দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী।
সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ক্লাস শুরু হলেও অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে বিদ্যালয় ত্যাগ করে। ইউনিফর্ম পরেই তারা বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় সময় কাটায়। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় নিয়মিত ক্লাসও ব্যাহত হচ্ছে।’
কলেজশিক্ষক আবু জাফর বলেন, ‘দ্রুত একজন কার্যকর প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।’
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে অন্য কোনো সরকারি বিদ্যালয় থেকে একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে বদলি করে আনা যেতে পারে। এতে শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের দুটি পদেই দ্রুত নিয়োগের বিকল্প নেই।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম বজলুর রশিদ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ কবে পূরণ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা
সম্ভব নয়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।’
- বিষয় :
- অসুস্থ