ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজের বাড়িতেই বন্দি বৃদ্ধ দম্পতি, ৮ বছর ধরে মই বেয়ে যাতায়াত

নিজের বাড়িতেই বন্দি বৃদ্ধ দম্পতি, ৮ বছর ধরে মই বেয়ে যাতায়াত
×

ছবি: সমকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:০৪

বাড়ির প্রধান ফটকটি খোলা। অথচ সেই ফটক দিয়ে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। সামনে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু ইটের দেয়াল। বাইরে যাওয়ার একমাত্র পথ এখন অন্যের বাড়ির ছাদ। আর সেই ছাদে উঠতে ভরসা একটি কাঠের মই।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী রাশিদা বেগমকে গত আট বছর ধরে এভাবেই প্রতিদিন বাড়ির বাইরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কখনো বাজারে যেতে, কখনো চিকিৎসকের কাছে, আবার কখনো প্রয়োজনীয় কোনো কাজে- প্রতিবারই তাদের পাড়ি দিতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ।

ঘটনাটি সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার নগরচর গ্রামের। ষাটোর্ধ্ব এই দম্পতি যেন নিজের বসতবাড়িতেই এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।

১৯৯৫ সালে ঝালকাঠি সদর উপজেলার মানপয়সা গ্রামের আনিসুর রহমান সাভারের নগরচর এলাকায় চার শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করেন। তখন বাড়ির পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী আসলাম হোসেন তার বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দেয়াল তুলে দেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, আনিসুর রহমান ও রাশিদা বেগমের বাড়ির সামনে উঁচু দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে যাওয়ার স্বাভাবিক কোনো পথ নেই। পাশের বাড়ির ছাদে ওঠার জন্য রাখা হয়েছে কাঠের মই। সেই মই বেয়ে ছাদে উঠে অন্যপাশ দিয়ে নিচে নেমে তবেই মূল সড়কে যেতে হয়।

যে বয়সে স্বাভাবিকভাবে সমতল রাস্তায় হাঁটাচলাই কষ্টকর, সেই বয়সে প্রতিদিন মই বেয়ে ছাদে ওঠা-নামা করতে হচ্ছে তাদের। একটু অসাবধান হলেই মই থেকে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমি ১৯৯৫ সালে এখানে এসে জমি কিনে বাড়ি করেছি। তখন বাড়ির পাশেই রাস্তা ছিল। পরে স্থানীয় আসলাম হোসেন আমার জমি ১০ লাখ টাকায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন। আমি রাজি হইনি। এরপর আমার বাড়ির গেটের সামনে দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় আট বছর ধরে মই দিয়ে অন্যের বাড়ির ছাদে উঠে বাইরে যেতে হচ্ছে।’

এই বৃদ্ধের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক অসুস্থতা। নিজের বা স্ত্রীর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একজন মানুষকেও স্বাভাবিক পথে বের করে নেওয়ার সুযোগ নেই।

রাশিদা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে নেওয়া খুব কষ্টের। অন্যের বাড়ির ছাদ দিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের অনেক কষ্ট হয়।’

দৈনন্দিন জীবনও তাই তাদের জন্য স্বাভাবিক নয়। বাজার করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া- সবকিছুর আগে ভাবতে হয় কীভাবে বাড়ি থেকে বের হবেন এবং কীভাবে আবার ফিরবেন।

অভিযোগের বিষয়ে আসলাম হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে তার বাড়ির ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমান বলেন, রেজা নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে আসলাম হোসেন চার শতাংশ জমি কিনেছেন। পরে আনিসুর রহমান বিএস রেকর্ডে জমির পাশ দিয়ে একটি রাস্তা রেকর্ড করে নেন। এ নিয়ে বিএস রেকর্ড বাতিলের জন্য আদালতে মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-২ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছি। ভুক্তভোগী পরিবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করব।

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে জায়গা দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আট বছর ধরে একটি মইই যেন এই বৃদ্ধ দম্পতির চলাচলের সঙ্গী। নিজের কেনা জমিতে, নিজের ঘরে থেকেও বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই তাদের। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুজন মানুষের প্রতিদিনের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এখন শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়, বরং একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আনে- নিজের বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য একজন বৃদ্ধ মানুষকে আর কতদিন অন্যের ছাদ আর একটি মইয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে ‍ৃ

আরও পড়ুন

×