স্কুল ভবনের জৌলুস ও শিক্ষকের বহরের আড়ালে শূন্যের হাহাকার
নতুন ভবনটি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ের
যশোর অফিস
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়। বাইরে থেকে লাল আর ধূসর রঙের চারতলা ভবন দেখে যে কারও মনে হবে– এক আধুনিক বিদ্যাপীঠ। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষাদানের এক বিশাল প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু ভেতরের দৃশ্যটা একেবারেই উল্টো। প্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদানের জন্য সরকারি বেতন-ভাতা তুলছেন ৯ জন শিক্ষক। অথচ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ জনের কম। সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় এই বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়েছিল একজন পরীক্ষার্থী। কিন্তু ফলে দেখা গেছে, সেই পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য।
এমন ভরাডুবির কারণ হিসেবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই ঢাল বানাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, আশপাশে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান থাকাতে এখানে কেউ ভর্তি হয় না। যারা ভর্তি হয়; তারাও নিয়মিত আসে না। এ কারণেই এসএসসি পরীক্ষায় এমন পরিস্থিতি।
এদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই অজুহাত মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, শিক্ষকদের প্রচণ্ড উদাসীনতা এবং নিয়মিত ক্লাস না করানোর সঙ্গে স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই আলোর মুখ দেখছে না বিদ্যালয়টি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রউফ বলেন, হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ের আধা কিলোমিটার দূরে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে আধুনিক কোনো ভবন নেই। কিন্তু ভাঙাচোরা টিনের ছাউনি আর আধাপাকা ভবনের এই স্কুলে ক্লাসমুখী ছাত্রছাত্রীরা। বালিকা বিদ্যালয়ের চেয়ে স্কুলটিতে পড়াশোনার মান ভালো বলেই সেখানে ভর্তি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
২০২৫ সালে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে অংশ নেয় পাঁচজন ছাত্রী। এর আগের বছরগুলোতেও চার থেকে পাঁচজন করে অংশ নিয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়টির প্রতিটি শ্রেণিতে বর্তমানে
চার থেকে সর্বোচ্চ ১০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
বিদ্যালয়টির এই করুণ অবস্থা সম্পর্কে সামিউর আলম নামে আরেক অভিভাবক বলেন, বিগত সময়ে বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি চলেছে বেশি। অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীরা বিগত সরকারের স্থানীয় এমপি ও শীর্ষ নেতাদের কর্মী ছিলেন। তারা সভা-সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নিয়মিত পাঠদান না হওয়াতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় বিমুখ হয়েছে।
চাকচিক্যময় ভবন না থাকলেও শূন্য পাসের দশা একই উপজেলার ভবদহ পারের চান্দুয়া-সমসকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ও। ফাঁকা বিলের ভেতরে স্থাপিত বিদ্যালয়টির মাঠে থই থই করছে পানি। বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক থাকলেও পড়াশোনা করে ৫০ জন শিক্ষার্থী। এবার তিনজন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হয়নি।
প্রধান শিক্ষক সুজিত বালা জানান, বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসিতে অংশ নেওয়া তিনজনের মধ্যে একজন নিয়মিত ও দুজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাদের কেউ পাস করতে পারেনি। প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। তবে বছরের বেশির ভাগ সময় স্কুল মাঠে পানি জমে থাকে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষেও পানি জমে থাকে। বিদ্যালয়ের এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা এখানে সন্তান পাঠাতে চান না বলে দাবি করেন তিনি।
এই দুটি বিদ্যালয় নয়; এবার যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১টি। শুধু এবারই প্রথম না গত এক যুগে বোর্ডটিতে ৫০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য ছিল।
বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, এসএসসি ও এইচএসসি মিলিয়ে এই সংখ্যা শতাধিক। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটি অবকাঠামোগতভাবে অত্যন্ত নাজুক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন না তারা।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের চরম উদাসীনতা ও অপেশাদার আচরণের কারণে অভিভাবকরা এখন আর তাদের সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে চান না। ফলে দিন দিন শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বারবার শূন্য পাসের তালিকায় নাম উঠলেও এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। মাঝেমধ্যে শোকজ করা হলেও পরে ব্যবস্থা নেয়নি একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। ফলে প্রতিবছরই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি পাভেল চৌধুরী বলেন, আসলে এটা অবাক করার বিষয়; বছরের পর বছর পড়িয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে যখন কেউ পাস করে না; এটা শিক্ষকদের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। এটার বড় কারণ হলো– শিক্ষা সেক্টরে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নেই। এখানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই যে সমস্যা সমাধান হবে এমনটি নয়; এখানে দরকার সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। দরকার শিক্ষাদানের কাঠামো পরিবর্তনের।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর আব্দুল মতিন বলেন, শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক দুর্বলতা কিংবা শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি এবার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন তারা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
- বিষয় :
- স্কুল