ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কচুরিপানায় ঢাকা পড়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, হুমকির মুখে চাষাবাদ

কচুরিপানায় ঢাকা পড়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, হুমকির মুখে চাষাবাদ
×

কচুরিপানায় ছেয়ে আছে সিংড়ার ডাহিয়া ইউনিয়নের তিসিখালী এলাকার কৃষি মাঠ সমকাল

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৩ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

শস্য ও মৎস্য ভান্ডারখ্যাত চলনবিল। চলনবিলে এখন পানিপ্রবাহের যথেষ্ট সুযোগ নেই। বদ্ধ পানিতে কচুরিপানায় ঢাকা পড়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এতে হুমকির মুখে পড়েছে চাষাবাদ। সময়মতো কচুরিপানা অপসারণ করা না গেলে আসছে বোরো মৌসুমে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগসহ স্থানীয় কৃষকরা।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরেজমিন সিংড়া এলাকার চলনবিল ঘুরে জানা গেছে, চলতি বছরে বন্যার পানিতে উপজেলার বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরি, ইন্দ্রাসন, মাগুড়া, বিলতাজপুর, সাতপুকুরিয়া, ইটালী, ডাহিয়া, সারদানগর, শেরকোল, চৌগ্রাম, জোলারবাতাসহ অন্তত ১৫ গ্রামের আবাদি জমিতে কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কচুরিপানা রাতারাতি বিস্তীর্ণ মাঠে ছড়িয়ে পড়ে নৌকা চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং বিলের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর মুখ বন্ধ হওয়ায় পানির স্রোতধারা না থাকায় কচুরিপানা ভেসে না গিয়ে কৃষি জমিতেই থেকে যাচ্ছে। অনেক কৃষকের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয়ে জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিপুল ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে।

সিংড়া উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৫ সালে বোরো মৌসুমে কচুরিপানার কারণে জোলারবাতা ও চৌগ্রাম বিলেই ১০০ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে ছিল। ওই বিলে বোরো ধান, গম ও সরিষা চাষাবাদ না করতে পারায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। এ ছাড়া গত বছরে বিলজুড়ে কচুরিপানার কারণে সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। 

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কৃষক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, গত বছর কচুরিপানা জমে তাঁর পরিবারের ৮০ বিঘা জমি অনাবাদি ছিল। এ ছাড়া তাদের জমির আশপাশে শতাধিক কৃষকের জমিতেও বোরো ধান চাষাবাদ সম্ভব হয়নি। এ বছর একই অবস্থা। চলনবিলের কৃষি বাঁচাতে সরকারিভাবে কচুরিপানা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বোরো ধান লাগানোর সময় প্রতি বিঘা জমি ১০-১২ হাজার টাকা খরচ করে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে হয়েছে। পরে সেই জমিতে ধান লাগানোর পরে এ বছর আগাম বন্যায় এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এবারও বিলে কচুরিপানার আগ্রাসী বিস্তার দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। ডাহিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী জুলহাজ হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে বিভিন্ন প্রকার দেশি মাছ ধরে সংসার চালান তিনি। এই বছরে কচুরিপানায় চলনবিল কানায় কানায় ভরে যাওয়ায় মাছ ধরতে পারছেন না। আমাদের গ্রামের প্রায় ৫০০ মৎস্যজীবী পরিবার আছে। সবাই হতাশায় পড়ে গেছি। 

উপজেলার তিশিখালী মাজারের দোকানদার ঝরু মিয়া বলেন, প্রায় ৩০ বছর এই মাজারে দোকানদারি করে পরিবার নিয়ে বেঁচে আছি। কচুরিপানার কারণে চলনবিলে নৌকা চলাচল করতে না পারায় পর্যটকের জনসমাগম নেই বললেই চলে। অন্যান্য বছরের তুলনায় বেচাকেনা অর্ধেকের কম। সারাদিন বেচাকেনা করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, দেশে উৎপাদিত ধানের এক-তৃতীয়াংশ এই চলনবিল থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে এখানকার ঘাটতি জাতীয় উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। আর বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে চলনবিলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ বলেন, অবস্থা ভয়াবহ হলে গত বছরের মতো এ বছরও বিলের অনেক জমি অনাবাদি হতে পারে। কচুরিপানা অপসারণের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
ইউএনও আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×