চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্প
প্রত্যাখ্যাত পাথর ব্যবহারের ‘পাঁয়তারা’
কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত নিম্নমানের পাথর। সম্প্রতি তোলা সমকাল
রিয়াদুল ইসলাম বাবু, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাঁচ বছর ধরে চলছে কুড়িগ্রামের চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণকাজ। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও শেষ হয়নি প্রকল্প, বেড়েছে ব্যয়ও। এরই মধ্যে নিম্নমানের বা ‘রিজেক্টেড’ পাথর ব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে। পরিত্যক্ত ঘোষণা করা পাথর দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ছয় দিন পরও তা প্রকল্প এলাকায় পড়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুযোগ বুঝে এসব পাথর দিয়েই কাজ শেষ করার পাঁয়তারা চলছে।
গত ৮ আগস্ট নির্মাণাধীন চিলমারী নদীবন্দর এলাকা পরিদর্শনে যান কুড়িগ্রাম-৩ ও ৪ আসনের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি এবং কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক। এ সময় প্রকল্প এলাকায় স্তূপ করে রাখা নিম্নমানের পাথর দেখে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে পাথরের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে জানানো হয়, এসব পাথর ইতোমধ্যে ‘রিজেক্টেড’ বা অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। পরে এমপি প্রকল্প এলাকা থেকে সেগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেন।
এদিকে নির্দেশের পাঁচ দিন পরও প্রকল্প এলাকায় পড়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সেই পরিত্যক্ত পাথর। নদীবন্দর টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে এই পাথর। স্থানীয়দের দাবি, অনেক পাথরই ময়লা-আবর্জনাযুক্ত, ভাঙাচোরা এবং নিম্নমানের।
জানা গেছে, কেএসএল-এসইএল জয়েন্টভেঞ্চার নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাথরগুলো প্রকল্প এলাকায় নিয়ে আসে। পরে বিআইডব্লিউটিএর এজেন্টের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় নিয়োগকৃত কনসালট্যান্ট পাথরগুলোর মান পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রায় তিন মাস আগেই পাথরগুলো ‘রিজেক্টেড’ ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছেন চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর সহকারী প্রকৌশলী মো. সেলিম রেজা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাজু ইব্রাহিম ও সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকেই প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে। এখন নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগ আমাদের আরও উদ্বিগ্ন করেছে। আমরা চাই, মান নিশ্চিত করা হোক।’
রেজাউল করিম ও মাসুম বলেন, ‘সরকারি অর্থের এই প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে কোনো আপস করা উচিত নয়। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই নিতে হবে।’
কথা হলে সহকারী প্রকৌশলী মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘রিজেক্টেড পাথর দিয়ে প্রকল্পের কোনো কাজ করা হয়নি। কনসালট্যান্টের মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পাথরগুলো বাতিল করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজে মানহীন বা রিজেক্টেড পাথর ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।’
সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রুকনুজ্জামান বলেন, ‘চিলমারী নদীবন্দর শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও নৌ-বাণিজ্যের সম্ভাবনার অন্যতম দ্বার। প্রকল্পটি দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসবে। তাই সময়ক্ষেপণ ও অনিয়মের ঊর্ধ্বে উঠে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা জরুরি।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বাস্তবায়নে ২০২১ সালের জুলাইয়ে চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। রমনা, রাজিবপুর, রৌমারী ও নয়ারহাট এলাকায় প্রকল্পটির বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে আছেন বিআইডব্লিউটিএর সহকারী প্রকৌশলী সেলিম রেজা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুশফিদুল হক এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ রাজিব।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও নদীতীর সংরক্ষণ, আরসিসি জেটি, টার্মিনাল ভবনসহ একাধিক কাজ চলমান রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
তারা প্রশ্ন করেছেন, প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী যাচাই ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? কোনো পাথর নিম্নমানের হলে তা প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর আগেই শনাক্ত হওয়ার কথা। তাহলে কীভাবে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের পাথর প্রকল্প এলাকায় এসে জমা হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু পাথর সরিয়ে ফেললেই অভিযোগের সমাধান হবে না। নিম্নমানের পাথর কীভাবে প্রকল্পে এলো, কার অনুমোদনে তা আনা হয়েছিল, এর পেছনে কোনো অনিয়ম বা যোগসাজশ ছিল কিনা এবং ইতোমধ্যে ওই পাথর দিয়ে কোনো কাজ করা হয়েছে কিনা—এসব বিষয়েও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
চিলমারী নদীবন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র রায় বলেন, ‘নির্মাণ প্রকল্পের সব তথ্য প্রকল্প পরিচালকের কাছে আছে। ওনার সঙ্গে কথা বলুন।’ প্রকল্প পরিচালক ও বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের মাত্র ৩৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য কাজ চলমান রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রিজেক্টেড পাথরগুলো প্রকল্প এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিকাদার সময় চেয়েছেন। তারা পাথরগুলো স্থানীয়ভাবে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন।’
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ওখানে রাখা পাথরগুলো রিজেক্টেড। সেগুলো অবশ্যই সরিয়ে ফেলতে হবে। বিষয়টির ওপর আমরা নজর রাখছি।’
এ বিষয়ে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি বলেন, ‘প্রকল্পস্থলে রাখা পরিত্যক্ত পাথর অবিলম্বে সরিয়ে নিতে হবে। পরিত্যক্ত পাথর ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমি নিজে পর্যবেক্ষণ করছি।’