ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ময়মনসিংহের গফরগাঁও

চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি এমপি বাচ্চুর স্ত্রী ও ভাই 

চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি এমপি বাচ্চুর স্ত্রী ও ভাই 
×

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৭

ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও বিএনপি নেতা আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর স্ত্রী ও ভাই উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তারা দুজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী শামীমা সুলতানা ও ভাই নাছির উদ্দীন একটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারা আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন। 

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধানমালা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনে নির্বাচনের নিয়ম থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি মনোনীত করা হয়নি। 

স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদের প্রধান কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যাবলি সঠিকভাবে পরিচালনা করা। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরিবারের দুজন চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে অন্যরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে।

শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, শামীমা সুলতানা কান্দিপাড়া আবদুর রহমান ডিগ্রি কলেজ এবং কান্দিপাড়া আলীমুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়– এই দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

কান্দিপাড়া আবদুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম সমকালকে জানান, গত বছরের ২১ এপ্রিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শামীমা সুলতানাকে সভাপতি করে কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কান্দিপাড়া আলীমুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ উদ্দিন জানান, গত ৭ জুলাই শামীমা সুলতানাকে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির প্রধান করে অনুমোদন দেওয়া হয়। 

আক্তারুজ্জামানের ছোট ভাই ও দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক নাছির উদ্দীন মাইজবাড়ির হাতেমতাই উচ্চ বিদ্যালয় এবং মাইজবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। 

হাতেমতাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড কমিটির অনুমোদন দেয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে নাছির উদ্দীনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে চূড়ান্তভাবে তার নামই পাস হয়। 

মাইজবাড়ি দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর নাছির উদ্দীনকে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি করা হয়। এ বছরের শুরুর দিকে তাকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের আগ পর্যন্ত মাদ্রাসাটির সভাপতি ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম উদ্দিন সরকার। 

উপজেলার নিগুয়ারি ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মিয়া সমকালকে বলেন, ‘নির্যাতিত বিএনপি নেতাদের বাদ দিয়ে সব জায়গায় পকেট কমিটি করছে এমপির পরিবারের লোকেরা। কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা কোনো পরামর্শ না করে একেকজন ব্যক্তিকে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সভাপতি পদে বসানো হচ্ছে।’ 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের নিয়ম

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধানমালা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মনোনীত বা নির্বাচিত হন। নির্বাচনের নিয়ম থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি মনোনীত করা হয়নি। 

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ. জ. ম. রেজাউল করিম খান সমকালকে জানান, সর্বশেষ পরিপত্র অনুযায়ী একজন ব্যক্তির একই ধরনের দুটি প্রতিষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে থাকতে কোনো বাধা নেই। 

রেজাউল করিম খান বলেন, অ্যাডহক কমিটিতে সভাপতির জন্য নির্বাচনের দরকার নেই। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হয়। এমপির পরিবারের সদস্যরা একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি দায়িত্ব পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দেখার সুযোগ আমাদের নেই। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ডিসির মাধ্যমে আমাদের কাছে যে তালিকা আসে, সে তালিকা অনুযায়ী কমিটি অনুমোদন করতে হয় আমাদের।’

এসব বিষয়ে জানতে গতকাল রোববার রাতে এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। অবশ্য তাঁর ভাই নাছির উদ্দীন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সমকালকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘সব নিয়ম মেনেই আমি সভাপতি হয়েছি। এখানে রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো প্রশ্নই আসে না।’

আরও পড়ুন

×