ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান শিক্ষক

তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান শিক্ষক
×

মো. জিল্লুর রহমান

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১১ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২৭

তিন দিনের ছুটি নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিও নেননি। দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও স্বাভাবিক পাঠদান ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২২ আগস্ট প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মাত্র তিন দিনের ছুটি নেন। পরদিন ২৩ আগস্ট তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। ওই ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসেননি। এরপর থেকে টানা সাড়ে তিন বছর ধরে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত।

শুধু এবারই নয়, এর আগেও ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। বিদ্যালয় সূত্রের দাবি, সে সময় তিনি দুই মাসের ছুটি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস চার দিন পর দেশে ফেরেন। ওই সময়ও বিদেশ যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশে ফিরে আসার পর তিনি সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। তবে বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করলেও তার চাকরির বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দাপ্তরিক কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘমেয়াদে একজন স্থায়ী প্রধানের অনুপস্থিতির প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ছে।

বিদ্যালয়ের একজন অভিভাবক বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে না থাকলে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়ে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কী কারণে তিনি এতদিন কর্মস্থলে নেই, তা পরিষ্কার করা দরকার।’

প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি নতুন নয়। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন দাশ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দেন।

ওই সময় ইউএনও বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। চিঠিতে প্রধান শিক্ষকের বিদেশে অবস্থান এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তবে এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষক এখনো বিদ্যালয়ে যোগ দেননি।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকী বলেন, ‘আমরা প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তিনি কবে বিদ্যালয়ে যোগ দেবেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানাননি। ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো তার পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়নি।’

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউসার বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। প্রধান শিক্ষক জিল্লুর রহমান বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনুমতি নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করার সুযোগ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। 

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘কোনো শিক্ষক দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শূন্য ঘোষণা করার ক্ষমতা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নেই। এ ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি আমি আজই জানতে পেরেছি। এর আগে এ বিষয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে; আমাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়নি। তবে বর্তমানে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সচিব বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী তার পদ শূন্য ঘোষণা বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।’

আরও পড়ুন

×