ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড

‘বলল—মা কালই দেশে ফিরব, এখন আমার সোনা কোথায় গেল?’

‘বলল—মা কালই দেশে ফিরব, এখন আমার সোনা কোথায় গেল?’
×

ছেলের মৃত্যুর খবরে আহাজারি করছেন দেবাশীষ দত্তের মা স্বপ্না দত্ত ও স্বজনরা। ছবি: সমকাল

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:০৫ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:০৬

‘কাল রাতেও আমার সোনার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হলো। হাসতে হাসতে বলল, মা কালই দেশে ফিরব। সবার সঙ্গে দেখা হবে। কত কেনাকাটা করেছে, সেগুলো দেখাল আমার সোনা। এমন খবর শুনতে হবে ভাবিনি। প্রতিদিন একবার করে কথা হতো সোনার সঙ্গে। আমার সোনা কোথায় গেল?’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার আবাসিক হোটেলে আগুনে স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুরসহ নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মা স্বপ্না দত্ত।

আজ বুধবার স্ত্রী-সন্তানসহ দেশে ফেরার কথা ছিল দেবাশীষের। কিন্তু দেশে ফিরছেন লাশ হয়ে। মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা যান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৮)। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত অন্যরা হলেন- দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৭), আড়াই বছর বয়সী শিশুপুত্র শর্ণশিষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী (৬৫)।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতা যান দেবাশীষ। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু যান তাঁরা। পরে চিকিৎসা শেষে কলকাতায় ফেরেন। বুধবার সকালে তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই রাতের আগুনে সব শেষ হয়ে যায়।

দেবাশীষের ভাইরা ফিরোজ হোসেন বলেন, তিনি ও তাঁর শ্বশুর আকরাম আলী চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে তিনি গত সোমবার বিমানযোগে দেশে ফেরেন। তবে তাঁর শ্বশুরসহ দেবাশীষের পরিবার কলকাতায় থেকে যায়। বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

বাবা-মায়ের কাছে রেখে যান মেয়েকে
কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন দেবাশীষ। সেখানে তাঁর মা-বাবা ও বড় মেয়ে দিবানীত দত্ত রয়েছে। ভারতে যাওয়ার সময় মেয়েকে দাদা-দাদির কাছে রেখে গিয়েছিলেন তিনি। এ কারণে প্রাণে বেঁচে গেছে শিশুটি।

আজ বুধবার দুপুরে আড়ুয়াপাড়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত বিলাপ করছিলেন। স্বজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বাবা-মা ও ভাইকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে ছিল দিবানীত। তার চোখে তখনও পানি।

দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, সকালে বারবার ফোন করেও ছেলের কোনো সাড়া পাচ্ছিলেন না। পরে দেবাশীষের ভাইরা ফিরোজ হোসেনের ফোনে একজন বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তা কথা বলেন এবং তাঁদের মৃত্যুর খবর জানান। তিনি বলেন, ‘এর আগে টেলিভিশনে দেখেছি কলকাতার হোটেলে আগুনে আটজন মারা গেছেন। এর মধ্যে আমার সন্তানরা থাকবে, কখনও ভাবতে পারিনি।’

দিলীপ কুমার আরও বলেন, ‘দেবাশীষ আমার একমাত্র সন্তান। সে পরিবারের খরচ চালাত। আমাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল সে। প্রতি মাসে আমার ও তার মায়ের প্রায় ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। এখন পরিবার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তা করছি। তার একমাত্র মেয়েটা মা-বাবা দুজনকেই হারাল। তাকে কীভাবে বড় করব, সেটাও ভাবতে হচ্ছে।’ ঘটনার তদন্ত দাবি করে সরকারের সহযোগিতাও চান তিনি।

মরদেহ আনতে কলকাতায় যাচ্ছেন ভাইরা
ফিরোজ হোসেন জানান, সকালে অনেকবার দেবাশীষের মোবাইলে ফোন করেও সাড়া পাননি। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ফোনটি ধরেন এবং তাঁদের মৃত্যুর খবর জানান।

তিনি বলেন, তাঁর ভিসা রয়েছে। পরিবারের পক্ষে মরদেহ গ্রহণ করতে তিনি বুধবার কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে বৃহস্পতিবার মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন বলে আশা করছেন।

পরিবার সূত্র জানিয়েছে, মরদেহ গ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ফিরোজ হোসেন পরিবারের পক্ষে মরদেহ গ্রহণ করবেন।

‘দেবাশীষ ছিল আপাদমস্তক সাংবাদিক’
দেবাশীষের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলনের বাজার পত্রিকার সম্পাদক আনিসুজ্জামান ডাবলু বলেন, ‘দেবাশীষ ছিল সবার প্রিয় একজন মানুষ। সে আপাদমস্তক সাংবাদিক ছিল। তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল সংবাদ নিয়ে। ভারতে যাওয়ার আগের দিনও আমার অফিসে এসেছিল। সকালে টেলিভিশনে দেখছিলাম কলকাতার হোটেলে আগুনে বাংলাদেশের আটজন মারা গেছেন। এর মধ্যে দেবাশীষ থাকবে, এটা কখনও ভাবিনি।’

বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি ও কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর বলেন, কলকাতার হোটেলে আগুনে আটজনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নিহত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘দেবাশীষের এমন চলে যাওয়া কুষ্টিয়ার সংবাদকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। দেখা হলেই হাসিমুখে কথা বলত। সবার প্রিয় ছিল দেবাশীষ। তার রেখে যাওয়া সন্তানের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার অনুরোধ জানাই।’

এদিকে বুধবার বিকেলে দেবাশীষের ভাড়া বাসায় সংবাদকর্মীদের ভিড় দেখা যায়। প্রিয় সহকর্মীর মৃত্যুর খবর লিখতে ও প্রচার করতে হবে—এমন পরিস্থিতি অনেকের কাছেই ছিল অকল্পনীয়।

আরও পড়ুন

×