ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবুর দুই বাচ্চার জন্য, ওরা আর বাবার আদর পাবে না’

‘বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবুর দুই বাচ্চার জন্য, ওরা আর বাবার আদর পাবে না’
×

প্রাইভেট পড়ে বাড়িতে ঢুকেই বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারে রোজা। এরপর কান্নায় ভেঙে পড়ে। ছবি: সমকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩৭ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩৯

‘বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবুর দুই ছোট বাচ্চার জন্য। ওরা আর বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারবে না, বাবার আদরও পাবে না। ওদের কীভাবে সান্ত্বনা দেব বুঝতে পারছি না।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোহাম্মদ আলী। তার ছোট ভাই আহাম্মেদ বাবু (৩৭) আর কোনো দিন বাড়ি ফিরবেন না। ফিরবেন ঠিকই, তবে জীবিত নয় লাশ হয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া নয়জনের মধ্যে আহাম্মেদ বাবুও আছেন। তিনি সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ী এলাকার মৃত আদম আলীর ছেলে। পরিবারের সদস্যরা বুধবার দুপুরে ভারতীয় হাইকমিশনের কাছ থেকে তার মৃত্যুর খবর পান। পরে পাঠানো ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন স্বজনেরা।

আহাম্মেদ বাবু পেশায় কসমেটিকস ব্যবসায়ী। আমিনবাজার বাসস্ট্যান্ডের এম এ হোসেন টাওয়ারের নিচতলায় ‘কিউট কসমেটিক অ্যান্ড জুয়েলারি’ নামে তার একটি দোকান রয়েছে। ব্যবসার কাজে নিয়মিত কলকাতায় যেতেন তিনি। সেখান থেকে কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্য কিনে এনে দেশে বিক্রি করতেন।

গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দোকানের মালামাল কিনতে বাসে করে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন বাবু। কেনাকাটা শেষ করে বুধবার সকালে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনেও কথা হয়েছিল তার।

আহাম্মেদ বাবু (৩৭)

সেদিন ফোনে জানিয়েছিলেন, দোকানের জন্য কেনাকাটা শেষ হয়েছে। বুধবার সকালে দেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন। কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত শোকে পরিণত হয়েছে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কলকাতার ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে আগুন লাগে। আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান বাবুসহ নয়জন। তাদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে।

বুধবার সকালে বাবুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ী শিকদার পাড়ায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা ছুটে আসতে থাকেন তার বাড়িতে। চারদিকে কান্নার শব্দ। কারও মুখে কথা নেই। যে বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছিলেন ছোট ভাই বাবুর ফেরার জন্য, সেখানে এখন অপেক্ষা তার মরদেহের।

বাবুর বড় ভাই মোহাম্মদ আলী বলেন, গত সোমবার আহাম্মেদ বাবু দোকানের মালামাল আনতে ভারতে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যেই ব্যবসার জন্য ভারতে যেত। আমাদের সবার ছোট ভাই ছিল বাবু। খুবই ভদ্র ও ভালো ব্যবসায়ী ছিল।

চার ভাইয়ের মধ্যে বাবুই ছিলেন সবার ছোট। বাবা মারা যাওয়ার পর বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে একই বাড়িতে থাকতেন তারা।

ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, মঙ্গলবার রাতেও আমাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। দোকানের জন্য কেনাকাটা শেষ করেছে বলে জানিয়েছিল। বুধবার তার দেশে ফেরার কথা ছিল। আমরা সবাই তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। সকালে হঠাৎ জানতে পারি, আগুনে সে মারা গেছে। এই খবর যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। কথার একপর্যায়ে নিজের ভাইয়ের দুই সন্তানের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মোহাম্মদ আলী বলেন, সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে ওর দুই ছোট বাচ্চার জন্য। ওরা আর বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারবে না, বাবার আদরও পাবে না। ওদের কীভাবে সান্ত্বনা দেব, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমাদের বাবা মারা গেছেন, মা বেঁচে আছেন। বাবু স্ত্রী, মেয়ে এলিনা হাসান রোজা (৮) ও ছেলে সোয়াদকে (৫) রেখে গেছেন। রোজা মিরপুর-১২ এলাকার ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বুধবার বিকেলে বাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের ভিড়। কেউ নীরবে বসে আছেন, কেউ কাঁদছেন। বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে আছে শোকে। এর মধ্যেই স্কুল শেষে প্রাইভেট পড়ে বাড়িতে ফেরে বাবুর মেয়ে রোজা। বাড়িতে ঢুকেই স্বজনদের কান্না দেখে বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারে সে। এরপর কান্নায় ভেঙে পড়ে।

প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার বাড়ি আর বাবুদের বাড়ি পাশাপাশি। ছেলেটা খুব ভালো ছিল। ব্যবসা করে সংসার চালাত। এত অল্প বয়সে বাবা হারানো শিশু দুটির কথা ভাবলেই খুব কষ্ট হচ্ছে। ওদের কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেলেছি। আল্লাহ যেন পরিবারটিকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দেন।

বাবুর আত্মীয় ও বন্ধু ইমরান হোসেন জানান, বুধবার সকালে আমার আরেক বন্ধু রকি ফোন করে বাবু নামে কাউকে চিনি কি না জানতে চায়। পরে তার ছবি পাঠালে আমি চিনতে পারি। তখন জানতে পারি, কলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগে সে মারা গেছে। খবরটি শোনার পর থেকেই মনটা ভেঙে গেছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার দুপুরে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাবুর মৃত্যুর খবর জানানো হয়। পরে তার ছবি পাঠানো হলে স্বজনেরা ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।

স্বজনেরা দ্রুত আহাম্মেদ বাবুর মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যে হোটেলে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। কোনো ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

×