ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকটের দোহাই দিয়ে শিক্ষক দম্পতির কোচিং বাণিজ্য

সংকটের দোহাই দিয়ে শিক্ষক দম্পতির কোচিং বাণিজ্য
×

মঙ্গলবার বিকেলে পরীক্ষা তদারকি করছেন বহিরাগত যুবক রিয়াদ হোসেন সমকাল

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১০ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রমত্ত পদ্মা পেরিয়ে ওপারে গেলেই কুমারখালী উপজেলার দুর্গম চরসাদিপুর ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নে অবস্থিত চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২৯৫ জন শিক্ষার্থীর এ বিদ্যালয়ে আছে মাত্র দুই শিক্ষক। কাকতালীয়ভাবে তারা দুজনই স্বামী-স্ত্রী। দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করা হলেও চরের এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার নামে তারা প্রকাশ্য অর্থ আদায় ও কোচিং বাণিজ্য করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষক সংকটের দোহাই দিয়ে এই শিক্ষক দম্পতি শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাইরের দুই যুবককে ‘ভাড়া’ এনেছেন। শুধু পাঠদানই নয়, বিদ্যালয়ের ভেতরেই বাধ্যতামূলক কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্য চালিয়ে শিক্ষার্থীদের থেকে প্রতি মাসে তুলে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা বেতন এবং ভাড়াটে শিক্ষকদের যাতায়াতের মোটরসাইকেল তেল বাবদ আরও ২০ টাকা।

উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে নদী পেরিয়ে এই দুর্গম এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা আর হাঁটা পথ। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে এই অনিয়মের চিত্র প্রত্যক্ষ করা গেছে।

বিকেল ৩টায় বিদ্যালয় ভবনে দেখা যায়, দুইটি কক্ষে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়নের ইংরেজি পরীক্ষা চলছে। তদারকি করছেন রিয়াদ হোসেন নামের এক যুবক। আরেকটিতে ছিলেন ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষক কামরুল হাসান। কার্যালয়ের ভেতরে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী সহকারী শিক্ষক গোলাপী পারভীন।

কথা হয় বহিরাগত আরেক শিক্ষক রিয়াদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক তাঁকে নিয়ে এসেছেন এবং আরেক ভাড়াটে শিক্ষক আলামিন নিয়মিত চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ও কোচিং করান।

শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের দুপুর দেড়টায় ক্লাস শুরু হলেও সাড়ে ১০টার মধ্যেই আসতে বাধ্য করা হয়। এসে কোচিংয়ে বসে টাকা দিতে হয়। অভিভাবকরা জানান, প্রতি মাসে ৩০০ টাকা বেতন এবং ২০ টাকা তেলের খরচ না দিলে সন্তানদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। অতি কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৪ সাল থেকে একই বিদ্যালয়ে অবস্থান করা এই শিক্ষক দম্পতি নিয়মিত ক্লাস নেন না এবং ভাড়াটেদের মাধ্যমে প্রভাব খাটান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক গোলাপী পারভীন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তার দাবি, যুবকরা কেবল সাহায্য করছেন। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত 
প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ জানান, দুইজনে ২৯৫ শিক্ষার্থী সামলাতে না পেরে বহিরাগতদের সহায়তা নিচ্ছেন। তবে টাকা জোর করে নয়, শিক্ষার্থীরা ভালোবেসে দিচ্ছে।

তবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানান, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষার ফি নেওয়া যেখানে অপরাধ, সেখানে বাইরের লোক দিয়ে প্রক্সি দেওয়ানো এবং টাকা তোলা চাকরিচ্যুতির মতো গুরুতর অপরাধ। এ ছাড়া ধরনের কাজ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে বিস্ময় প্রকাশ করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুম মনিরা। তিনি জানান, বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রথম জানতে পারলেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, ঘটনাটি সরেজমিন তদন্ত করে অপরাধী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমারখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, সরকারি স্কুলে প্রক্সি শিক্ষক ও ফি আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×