জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখে ফারিহা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছে ফারিহা মনি সমকাল
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মেয়েদের ফুটবলে সেরা প্লেয়ার হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেই। ভাবতেই পারছিলাম না, আমি সেরা খেলোয়াড়। স্টেজের অনুভূতিটা ছিল একদম অন্যরকম। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ট্রফিটা নিচ্ছি পাশেই ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তখন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে বলছেন– এ ফারিহা। প্রধানমন্ত্রী বলছেন আমি ওকে চিনি, ওর ভিডিও আমি দেখেছি, ও ফারিহা। তখন আমি প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দিলাম। ওনি যে আমাকে চেনে এটাই আমার পাওয়া।’ গর্ব নিয়েই কথাগুলো বলছিল নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে মেয়েদের ফুটবলে সেরা খেলোয়াড় জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা মনি।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে মেয়েদের ফুটবলের বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহী বরিশালকে ৫ গোলে হারায়। রাজশাহীর পক্ষে ৫ গোলই করে ফারিহা। যদিও টুর্নামেন্টের ফাইনালে রংপুরের বিপক্ষে হেরে যায় রাজশাহী। তবে গোলের সংখ্যা ও খেলার নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতে ফারিহা।
ফারিহার বাবা মুকুল হোসেন ও মা আজেলা বেগম দুজনেই দিনমজুর। বাকপ্রতিবন্ধী বাবা ও মায়ের সংসারে এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নাম ফারিহা। সে স্থানীয় নান্দরায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
লালপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত নান্দ বাজার এলাকায় ফারিহার বাড়ি। দিনমজুর পরিবারের মেয়ে ফারিহার বাড়িতে যাওয়ার তেমন কোনো রাস্তা নেই। ঝোপঝাড় আর কাঁদা মাড়িয়ে যেতে হয় তার বাড়িতে। গতকাল বুধবার তার বাড়িতে যেতেই মাটির দেয়ালের ঘরের পাশের ওঠানে ফারিহার দেখা মিলল। সে তার বাবার সঙ্গে পাট শুকাচ্ছিল।
আলাপকালে নিজের সংগ্রামী জীবনের গল্পের ঝুড়ি মেলে ধরে ফারিহা বলে, আমার উঠে আসাটা সহজ ছিল না। একদিন পাশের বাড়িতে টিভিতে ফুটবল খেলা দেখছিলাম। যখন গোল করে তখন সবাই উল্লাস করে। আমিও ভাবতাম আমাকে নিয়ে যদি আমার এলাকার মানুষ এমন উল্লাস করত। এখান থেকেই ফুটবল খেলার নেশা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ে আমাদের স্কুলের হয়ে গোল্ড কাপ টুর্নামেন্টে প্রথম খেলেছিলাম। আমরা জিতেও ছিলাম। তখন ভাবলাম ফুটবলকেই আমি পেশা হিসেবে নেব। একদিন খলিসাডাঙ্গা নদীর পাশে ফুটবল কোচ জুয়েল রানার সঙ্গে দেখা হয়। তাঁকে ফুটবলে আমার আগ্রহ সম্পর্কে জানাই। জুয়েল স্যার আমার পরিবারকে রাজি করান। বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে স্যারের নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে আমি প্র্যাক্টিস করতে যেতাম। এভাবেই ফুটবল জীবনে পা রাখি। অনেকদিন ফুটবল খেলে এসে রাতের খাওয়াটাও পাই নাই। আজ সেই প্রতিদান পেয়েছি, আর কোনো কষ্ট নেই।’
ফারিহার মা আজেলা বেগম বলেন, আমাদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে ফরিয়া আমার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরেছে। সেই মাছ বাজারে বিক্রয় করে গোপালপুর গিয়ে খেলাধুলা করেছে। আমি জুতাও কিনে দিতে পারি নাই। এক সময় খেলতেও বারণ করেছিলাম। এখন ফারিহাই আমাদের সব।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ফারিহা বলে, ‘আগামীতে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চাই। দেশের জন্য কিছু করতে চাই। আমার আশা, একদিন লাল-সবুজের পতাকা হাতে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াব।’
সমালোচকরা এখন প্রশংসাকারী
ফারিহার ফুটবল খেলা নিয়ে এক সময় অনেক কথাই শুনতে হয়েছে তার পরিবারকে। কিন্তু সেইসব দিন এখন অতীত। জাতীয় পর্যায়ে ফারিহার সাফল্যের পর তাদের গ্রামের গল্পও রাতারাতি বদলে গেছে। ফারিহা জানায়, এক সময় যারা তাকে নিয়ে কটু কথা বলেছে এখন তারাই তাকে সম্মান করছে। সমাজে যারা তার খেলার বিরোধিতা করেছে তারাই ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কখন সে গ্রামে কখন ফিরবে এই অপেক্ষায়। এলাকার অনেকেই তাকে এখন প্রশংসা করছে। বলছে, তোমার খেলা আমরা টিভিতে দেখেছি।
নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও ফারিয়ার কোচ মো. জুয়েল রানা বলেন, একসময় জাতীয় স্টেডিয়ামে খেলেছি। ইনজুরিতে পড়ে আর খেলতে পারিনি। ফুটবল খেলার ভালোবাসা থেকে নাটোর থেকে ৩০টা মেয়েদের একটা ক্যাম্প করানোর ডাক পাই। আমি যখন তাদের প্র্যাক্টিস করাই। তখন তাদের নিয়ে কাজ করার চিন্তা আসে। একদিন আমি নদীর ধারে মাছ ধরছিলাম। তখন ফারিহা মনি এসে বলে স্যার আমি ফুটবল খেলতে চাই। ওর মধ্যে ফুটবল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখেছি। সেই থেকে আমি ওকে নিয়ে প্র্যাক্টিস করাতাম। এরপর সে আমার একাডেমি থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়।
- বিষয় :
- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান