ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘মরণ জাইন্নাই তারা বিদ্যাশ গেছে’

‘মরণ জাইন্নাই তারা বিদ্যাশ গেছে’
×

 পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ ও তাজউদ্দিন আহমদ, জগন্নাথপুর (সিলেট)

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমি তো জোর করে কাউকে বিদ্যাশ পাঠাইছি না। যারা গেছে মরণ জাইন্না গেছে। আমি তো কদ্দুছ মিয়ার মতো সরাসরি কাজ করি না। বেশি বেশিও করি না। আরও মাইনসে এই কাম করে। একজন পাঠাইলে আমি মাত্র ১০ হাজার টাকা পাই।’

কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের মাসুক মিয়ার ছেলে খসরু মিয়া। তিনি বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে মধ্যস্থতা (দালালি) করেন। সম্প্রতি পাথারিয়ার আব্দুল করিমকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য মধ্যস্থতা করেন খসরু। গতকাল বুধবার সমকালের কাছে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে গ্রিসের পথে রওনা দেওয়ার পর থেকে আব্দুল করিমের খোঁজ মিলছে না। তাঁর মতো শান্তিগঞ্জের অনেক যুবকেরই খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। এসব পরিবারে দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে।

নৌকায় লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ১১ দিন ভেসে থাকার পর ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও গরমে ১১ জন মারা যান। এর মধ্যে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি। এ ঘটনার পর সুনামগঞ্জের অনেক যুবকের খোঁজ মিলছে না। এদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সাগরপথে গ্রিসে পাঠানো দালালরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। তাদের মধ্যে কদ্দুছ মিয়া ও খসরুর নাম জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। কদ্দুছ ও খসরুকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ এখনও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকেনি। ডুংরিয়া গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, কদ্দুছ ও খসরু একসময় কৃষিকাজ করতেন। তারা বিদেশ মানুষ পাঠিয়ে ধনী হয়ে গেছেন।

কদ্দুছ জানান, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলার শত্রুমর্দনের রন্টু পালের ছেলে হৃদয় পাল এবং ডুংরিয়া গ্রামের উত্তরপাড়ার ইছন মিয়ার ছেলে সোহেল মিয়াকে পাঠাতে টাকা লেনদেন হয়েছে তাঁর মাধ্যমে। গতকাল বুধবার এ বিষয়ে রন্টুকে জিজ্ঞেস করলে বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কদ্দুছের সঙ্গে তাঁর ছেলের ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। হৃদয় লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ডুংরিয়া বাজারে গিয়ে তিনি ছয় লাখ টাকা কদ্দুছকে দিয়ে আসেন। বাকি সাত লাখ শান্তিগঞ্জের এক দোকানির কাছে জমা আছে। 

মঙ্গলবার রাতে কদ্দুছ রন্টুকে বলেন, ‘দুশ্চিন্তা করবেন না। হৃদয় মিসরের পোর্ট সাইদে আছে।’ রন্টু জানান, তিনি কদ্দুছকে বলেছেন, তাঁর ছেলেকে ভিডিও কলে দেখাতে হবে। কিন্তু পারেননি।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সাগরপথে তরুণদের বিদেশ পাঠানোর দালাল খুঁজলেও কদ্দুছ ও খসরুদের তথ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে নেই। ইউএনও হিল্লোল চাকমা বলেন, ‘আমরা দ্রুতই এই বিষয়ে খোঁজ নেব।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বললেন, দালালদের তথ্য এখনও পুলিশকে কেউ জানায়নি।

জগন্নাথপুরে ৬ যুবকের পরিবারে আহাজারি
সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার ছয় যুবকের খোঁজ মিলছে না। তাদের মধ্যে কেউ এক মাস, আবার কেউ ২০ দিন ধরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। স্বজনরা দিনরাত উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। কেউই জানেন না তাদের সন্তান বেঁচে আছে কিনা। 

নিখোঁজ যুবকরা হলেন– উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাঘময়না গ্রামের আখল মিয়ার ছেলে জুয়েল আহমদ টিপু (২৩), একই ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে হাবিব উল্লাহ (২৮), কলকলিয়া ইউনিয়নের হিজলা গ্রামের ছালিক মিয়ার ছেলে ইউসুফ আলী (২০), সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের কুড়িকেয়ার গ্রামের মৃত আব্দুল কদ্দুছের ছেলে সায়েক মিয়া ও চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া (মরল বাড়ী) গ্রামের জম্মাত আলী ছেলে রুবেল মিয়া ও পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের সাইফু মিয়া।

সাগরপথে লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে যে রাবার বোট রওনা দেয়, তার মধ্যে জগন্নাথপুরের তিনজন ছিলেন। তারা হলেন জুয়েল, হাবিব, ইউসুফ। আর ছয়জনের মধ্যে একজন মিসরের হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কিন্তু তাঁর নাম কেউ জানাতে পারেননি। ছয়জনের কোনো খোঁজ পরিবার পায়নি।

স্বজনরা বলছেন, নিখোঁজ যুবকদের বিদেশ পাঠাতে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সঙ্গে জনপ্রতি ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়। পাঁচ মাস আগে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁওয়ের দালাল আজিজের মাধ্যমে ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার কথা হয় হাবিবের। ৩ আগস্ট রাতে তিনি লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর থেকেই হাবিব নিখোঁজ।

তাঁর বড় ভাই আব্দুল্লাহ বলেন, ‘গেম দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে হাবিবের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল। এরপর ৩ আগস্ট তার গেম হয়। এরপর থেকে আমরা তার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। এমনকি দালালও খোঁজ দিতে পারছে না।’

একই ইউনিয়নের বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু ছয় মাস আগে দিরাই উপজেলার এক দালালের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া যান। সেখান থেকে ৩ আগস্ট গ্রিসে যাওয়ার জন্য গেমে উঠলে তিনি নিখোঁজ হন।

ইউসুফ ও সায়েক ২৬ লাখ টাকা চুক্তিতে চিলাউড়া গ্রামের করিম দালালের মাধ্যমে গত ১ জুলাই বাড়ি ছাড়েন। লিবিয়া পৌঁছে এক মাস আগে গ্রিসের উদ্দেশে গেমে অংশ নেন। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ। ভবানীপুরের সাইফু ১৮ জুলাই লিবিয়া থেকে গেমে উঠে এক মাস ধরে নিখোঁজ।

জগন্নাথপুরের ইউএনও ইসলাম উদ্দীন বলেন, ‘আমরা নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছি।’

আরও পড়ুন

×