এক কক্ষে পাশাপাশি চলে সব শ্রেণির পাঠদান
মক্তবের এক কক্ষে বসে নারায়ণখোলা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সমকাল
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বিলীন হয় ১৯০ বছরের পুরোনো নারায়ণখোলা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই ঘটনায় অনেকটা ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে শেরপুরের নকলা উপজেলার চরঅষ্টধার ইউনিয়নের চরাঞ্চলের খুদে শিক্ষার্থীরা। এরপর শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ঠিকানা হয় একটি পরিত্যক্ত মক্তবে।
প্রায় পাঁচ বছর সেখানে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পাঠদান চলছে। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা, ওয়াশরুম ও বসার জায়গা। পাঠদানের পরিবেশ না থাকায় কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। দীর্ঘ পাঁচ বছরেও চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য স্থায়ী বিদ্যালয় স্থাপনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চরঅষ্টধার ইউনিয়নের চরাঞ্চল ঘুরে জানা গেছে, চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নারায়ণখোলা দক্ষিণ গ্রামে ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয় বিদ্যালয়টি। প্রায় পাঁচ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদে গিলে খেয়েছে বিদ্যালয়ের ভবন। নিজস্ব ঠিকানা হারানোর পর ৩০০-৪০০ মিটার দূরে পরিত্যক্ত মক্তবে বিদ্যালয়টির পাঠদান চলছে। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে শতাধিক অন্যত্র চলে গেছে। শিক্ষকদের কেউ বলছেন, অন্য বিদ্যালয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, ঝরে পড়েছে। মাত্র ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থীকে অনেক কষ্টে পাঠদান করে যাচ্ছেন শিক্ষকরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা চলছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থী একই কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষকরা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই কক্ষের পাশেই রয়েছে মক্তবের টয়লেট। অপরিচ্ছন্ন আর সেটির দুগর্ন্ধে শ্রেণিকক্ষে বসা দায়।
কথা হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়েল মাহমুদ রিয়াদ, চতুর্থ শ্রেণির মারিয়া আক্তার দোহা ও তৃতীয় শ্রেণির তাহমিদ হাসানের সঙ্গে। রিয়াদের ভাষ্য– একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে টয়লেটের দুর্গন্ধ। খাবার জন্য নেই সুপেয় পানি। তাই পাঠদান ও পরীক্ষা দিতে কষ্ট হয়।
দোহা জানায়, একই কক্ষে প্রতিদিন ৭০-৮০ জনের একসঙ্গে পাঠদান করায় শিক্ষকদের কথা বুঝতে পারে না তারা। বিদ্যালয়ের নিজস্ব টয়লেট না থাকায় মেয়েদের খুব কষ্ট।
তাহমিদ হাসান বলে, ‘আমাদের স্কুল নেই। মক্তবের ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে ভালো লাগে না। খেলাধুলা করা যায় না। বিদ্যালয়ে এলে শুধু ছোট্ট ঘরেই বসে থাকতে হয়।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদুল হাসান জানায়, মক্তবের ছোট্ট কক্ষে কোনো পার্টিশন নেই। একটি কক্ষে একই সময়ে ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থীকে ছয়জন শিক্ষক পাঠদান করান। পাঠদানের সময় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী কেউ পড়ায় মনযোগ দিতে পারে না। কক্ষের পাশেই মক্তবের টয়লেট। তার পাশেই শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের বসার স্থান। প্রতিদিন কষ্ট করে পাঠদান করতে হয়। কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। মেয়েরা তো ওয়াশরুমের অভাবে খারাপ অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। জানি না কত দিনে দূর হবে আমাদের যন্ত্রণা।’
প্রধান শিক্ষক শামসুন্নাহার জানান, ১৯০ বছরের পুরোনো বিদ্যালয়টি ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হওয়ার পর পাশের পরিত্যক্ত একটি মক্তবে তাদের ঠাঁই হয়েছে। কিছুটা সংস্কার করে প্রায় পাঁচ বছর এখানে পাঠদান চলছে। তাঁর ভাষ্য, আগে চরাঞ্চলের নামকরা প্রতিষ্ঠান ছিল বিদ্যালয়টি। কিন্তু নদী ভাঙন শুরু হলে অভিভাবকরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দেন। দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন ৮০ জন আছে। একটি কক্ষে প্রতিদিন ৮০ শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক একই সময়ে পাঠদান শুরু করলে কী অবস্থা হয় আপনারাই বিবেচনা করুন। শ্রেণিকক্ষে নেই পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা। প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে পড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী। মক্তবের টয়লেটের দুর্গন্ধে স্কুলে আসতে চায় না শিক্ষার্থীরা। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসেছেন। তারা আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করছি আমাদের সুদিন আসবে। ভবন পাব।’
নকলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম রব্বানী বলেন, বিদ্যালয় না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের বসার জায়গা নেই। পানি ও ওয়াশরুমের সুব্যবস্থা নেই। নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষকরা।
নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের একটি উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জায়গা পেলেই ভবন নির্মাণকাজ শুরু হবে। চলতি অর্থবছরেই দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে আশা তাঁর।
- বিষয় :
- বিদ্যালয়