ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভূমি জটিলতায় থমকে ৩০ কোটি টাকার সেতুর কাজ

ভূমি জটিলতায় থমকে ৩০  কোটি টাকার সেতুর কাজ
×

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ঝুলে আছে তিন বছর ধরে। পাশের বেইলি ব্রিজ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে মানুষ সমকাল

 এ কে এস রোকন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ 

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতুর কাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। এখনও প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ বাকি। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও বর্ষাকে কারণ দেখিয়ে পাঁচ মাস ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কাজ। এর আগেও তিন দফা কাজ বন্ধ হয়েছিল। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো বেইলি সেতু ব্যবহার করে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের প্রায় চার লাখ মানুষ। 

ব্যবসায়ীদের ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ঘুরে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে, শিক্ষার্থী ও রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, পল্লি সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় ১৭২ দশমিক ৩০০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৫ টাকা। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। তবে নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সেতুর পাশেই রয়েছে বহু পুরোনো একটি বেইলি সেতু। সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তিন বছর আগে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেতুর প্রবেশমুখে ইটের পিলার বসিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে দুর্লভপুর ও মনাকষা এলাকার ব্যবসায়ীদের পণ্য আনতে কানসাট হয়ে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। সরু এক লেনের বেইলি সেতুতে সারাদিন যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের সময় ও বাজারের দিনে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৯১-৯২ সালে বেইলি সেতু নির্মাণের সময় দুই একর ৬৫ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। বর্তমানে নতুন সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য আরও কিছু জমির প্রয়োজন হয়েছে। এ নিয়ে অন্তত ১৪টি পরিবারের বাড়ি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনও তা শেষ হয়নি। ফলে সংযোগ সড়কের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের মার্চে কয়েক দফায় উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশপ্রাপ্তরা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। 

এরপর থেকে পুরো বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত চারবার কাজ বন্ধ হয়েছে। শুরুতে নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে এলাকাবাসী বাধা দিলে তদন্তের পর কাজ আবার শুরু হয়। পরে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে দ্বিতীয় দফায় কাজ বন্ধ হয়। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং বর্ষার কারণে প্রায় তিন মাস ধরে কোনো কাজই হচ্ছে না।
দুর্লভপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. গোলাম আজম বলেন, ‘একদিকে প্রশাসন বলছে, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। এই জটিলতা নিরসন না হওয়ায় তিন ইউনিয়নের মানুষ মহাদুর্ভোগে পড়েছেন। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া প্রয়োজন।’
দুর্লভপুরের মুদি দোকানি শাহিন আলী বলেন, ‘শিবগঞ্জ বাজার মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। অথচ ট্রাকে মাল আনতে এখন ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
মনাকষার বাকরুলী-বিশ্বনাথপুর গ্রামের হারুন অর রশিদ বলেন, ‘একদিন জরুরি কাজে জেলা শহরে যাওয়ার সময় বেইলি সেতুর যানজটে আধাঘণ্টা আটকে ছিলাম। পরে দুই কিলোমিটার হেঁটে শিবগঞ্জ শহরে যেতে হয়েছে। ততক্ষণে যার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, তিনি চলে গেছেন।’
শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘একসঙ্গে দুটি অটোরিকশা পার হতে গেলেই দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারি না। পরীক্ষার সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়।’

নোটিশপ্রাপ্ত বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, ‘আমরা অনেক বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া কোথায় যাব?’
বায়েজিদ, তোহরুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, ‘আমরা অসহায় মানুষ। বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করলে চলে যাব। কিন্তু মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় ছেড়ে ক্ষতিপূরণ ছাড়া সরে যাওয়া সম্ভব নয়।’
ভুক্তভোগী সুমাইয়া খাতুন বলেন, ‘আমাদের সব কাগজপত্র রয়েছে। তারপরও প্রশাসন জমির দাম নির্ধারণ করছে না। শুধু নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ১৯৯২ সালে বেইলি সেতু নির্মাণের সময় যাদের জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল, তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। এখন যাদের নিয়ে বিরোধ, তাদের অনেকে সরকারি জমিতে বসবাস করছেন। তবে বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধান করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. সাহিন আলম বলেন, ‘ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন–এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বন্যা, বর্ষা এবং ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই কাজ বন্ধ রয়েছে। জটিলতা মিটলেই কাজ শুরু হবে।’

ঠিকাদার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘নির্মাণে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি হয়নি। জমি-সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান হলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষার কারণে নদীর মাঝের গুরুত্বপূর্ণ পিলারের কাজ বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি এখনও বুঝে পাওয়া যায়নি। জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত কাজ শুরু করা যাবে।’
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হারুণ অর রশিদ বলেন, ‘সরেজমিনে মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যাও নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে বিষয়টি এলজিইডির সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

আরও পড়ুন

×