সুগন্ধা-কলাতলী পয়েন্ট
কক্সবাজারে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণ
জাইকার অর্থায়নের বাস্তবায়ন করছে পৌরসভা
কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত উপকূলীয় সৈকতের বিশাল এলাকা ভরাট করে চলছে সড়ক নির্মাণ। এ কারণে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থার একাধিক ডেইল। গতকাল শুক্রবার তোলা সমকাল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ সড়ক। এতে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে সাগরলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয়রোধে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বালুর ডেইল। পাশে বিকল্প জায়গা থাকার পরও সৈকত ভরাট করে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এ ডেইল সৃষ্টিতে কাজ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, দেশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ১৩টি এলাকার (ইসিএ) একটি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। ইসিএ আইনমতে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন যে কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, মাটি, পানি ও বায়ুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করতে পারে– এমন সব কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সরেজমিন দেখা গেছে, শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে সৈকতের বিশাল এলাকা ভরাট করে চলছে সড়ক নির্মাণ। এ কারণে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ডেইল। ধ্বংস করা হচ্ছে সাগরলতা এবং লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স-এনডিইর পক্ষে তারা কাজ করছেন।
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্র জানায়, শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত উপকূলীয় এ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’। ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২৮ মিটার প্রস্থ এ সড়ক নির্মাণের দরপত্র প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ জুন। ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নির্মাণের কাজটি পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স-এনডিই নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া সমকালকে বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়টি কক্সবাজার পৌরসভা বলতে পারবে।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া সমকালকে বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার্থে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। ইসিএ এলাকা হিসেবে এ জায়গায় যে কোনো ধরনের কাজ করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কেউ ছাড়পত্র নেননি।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বেশ কিছু উন্নত দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ক্ষয়রোধ করতে প্রাকৃতিক উপায়ে সৈকতে বালুর ডেইল সৃষ্টি করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। এমনকি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এ ডেইল সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ পাশেই বিকল্প জায়গা থাকার পরও সৈকতে সড়ক নির্মাণের নামে এ ডেইলগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। দাতা দেশগুলো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেবে না। নির্মাণকাজ শিগগির বন্ধ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে কক্সবাজারে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। এ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জোনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা
যাবে না। এর পরও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে সড়ক নির্মাণ দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান
জানান তিনি।
- বিষয় :
- সড়ক