লাল নিশানে ঘিরে বিপর্যস্ত হাওর রক্ষার চেষ্টা
সংরক্ষিত এলাকা চিহ্নিত করতে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রবেশ মুখে শনিবার পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে টানানো লাল নিশান সমকাল
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সংরক্ষিত এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌযানের প্রবেশ ঠেকাতে প্রবেশমুখগুলোতে লাল নিশান টাঙিয়ে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হকের নেতৃত্বে হাওরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখে এসব লাল নিশান টাঙানো হয়। এ সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম, জয়পুর-গোলাবাড়ি ভিসিজি কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ কবীর, ইন্দপুর ভিসিজি কমিটির সভাপতি অখিল তালুকদারসহ স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, জয়পুর, গোলাবাড়ি ও রামসিংহপুর-দাসপাড়া চ্যানেল দিয়ে মধ্যনগর ও কলমাকান্দা থেকে আসা নৌযানগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ রোধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাওরে আসা পর্যটক ও হাউসবোটগুলোর সচেতনতায় জয়পুর ও গোলাবাড়ি এলাকায় ৬টি নির্দেশনা-সংবলিত বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়।
বিলবোর্ডে উল্লিখিত নির্দেশনাবলী রয়েছে– হাওরে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) প্লাস্টিক সামগ্রী (যেমন– স্ট্র, প্লাস্টিকের প্লেট, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল) ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, মাইক বাজানো, হৈচৈ করা এবং উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা করা যাবে না, সব হাউসবোট জয়পুর-গোলাবাড়ি-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করতে হবে। ওয়াচ টাওয়ার-সংলগ্ন এলাকা এবং কোর জোনে কোনো হাউসবোট বা ট্রলার প্রবেশ করতে পারবে না, হাওরে পাখি শিকার, ক্রয়-বিক্রয় ও বহন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং হাওরের হিজল, করচসহ সব ধরনের গাছপালা কাটা নিষিদ্ধ। এতে বলা হয়, এসব বিধি-নিষেধ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রামসার সাইট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। পর্যটন বিকাশের নামে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি খেয়াল রেখে এখানে ইকোট্যুরিজম বিকাশের কথা থাকলেও তা মান্য করা হয়নি।
হাওর ভ্রমণের নামে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক হাউসবোট ও ইঞ্জিনচালিত ছোট-বড় নৌকা নিয়ে ঘুরছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দেখা যায়, হাওরে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিকের বোতল, চিপস, ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের চায়ের কাপ, বিভিন্ন রকমের খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হাওরে।
এ সব প্লাস্টিকের বর্জ্য হাওরের পানিতে ভাসতে দেখা যায় নিয়মিত। এ ছাড়া, হাউসবোট থেকে রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, খাবারের অবশিষ্টাংশ, পচা শাকসবজির খোসা– এই জৈব বর্জ্যগুলো সরাসরি হাওরের পানিতে ফেলা হচ্ছে। এর চেয়েও তীব্র সমস্যা হলো, হাউসবোটগুলোতে সেপটিক ট্যাঙ্ক না থাকায় প্রতিদিন শত-শত পর্যটকদের মলমূত্র এবং পয়ঃনিষ্কাশনের পানি মিশে যাচ্ছে হাওরের স্বচ্ছ জলের সঙ্গে। এই বর্জ্যগুলো পানিকে নিয়মিত দূষিত করছে। যার কারণে দিনদিন জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
একইভাবে, ইঞ্জিন থেকে নিঃসৃত তেল, ডিজেলসহ অন্যান্য তৈলাক্ত বর্জ্য হাওরের পানিতে পরে পানির ওপরে একটি বিষাক্ত স্তর তৈরি করছে। সূর্যের আলো এবং অক্সিজেন কমিয়ে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট বেলার ব্যবস্থা করা, হাউসবোটে বর্জ্য ফেলার জন্য পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর নিয়ম প্রণয়ন করা আবশ্যক।
সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর একটি পরিবেশগত সাময়িকভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে লাল নিশান ও নির্দেশনামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার (পুহাস) সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় পর্যটকবাহী হাউস বোট প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে প্রশাসন যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তা তারা সমর্থন করেন ও সহযোগিতায় প্রস্তুত।
- বিষয় :
- হাওর