১১ কোটির প্রকল্প থমকে ব্যতিক্রমী নকশা ও ‘দক্ষ মিস্ত্রি’র অজুহাতে
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার তিস্তা খালের ওপর নির্মাণাধীন সেতু। সম্প্রতি উপজেলার রাধাবল্লভ রাজারঘাট এলাকায় সমকাল
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে সচল করা হবে যোগাযোগ ব্যবস্থা– এমন প্রতিশ্রুতিতে ভেঙে ফেলা হয়েছিল তিস্তা খালের ওপরের পুরোনো সেতুটি। অথচ প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে অতিরিক্ত সময় গড়ালেও অর্ধেকের বেশি কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। প্রায় ১১ কোটি টাকার আরসিসি গার্ডার সেতুর কাজের এই ধীরগতি ও তদারকির অভাব এখন স্থানীয়দের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। দুই বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে কাঠের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হতে হচ্ছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রাধাবল্লভ রাজারঘাট এলাকায় হাজার হাজার বাসিন্দাকে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সূত্র জানায়, তিস্তা খালের ওপরের পুরোনো সেতুটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিপি) যৌথ অর্থায়নে ‘ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের’ আওতায় ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪৩২ টাকা ব্যয়ে ৬০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স এমএ ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘মেসার্স খাইরুল এন্টারপ্রাইজ’ কাজটি পায়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিলের মধ্যে পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার কথা। অথচ নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে চার মাসের বেশি সময় পার হলেও কাজের অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশে।
কাজ শুরুর সময় পুরোনো সেতুটি গুঁড়িয়ে দিয়ে পাশে কাঠ ও বাঁশের পাটাতন দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো বানিয়ে দিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেই সাঁকোটি এখন জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছে। সরু এই কাঠের সাঁকো দিয়ে পথচারীদের পাশাপাশি হালকা যান পারাপারের সময় কেঁপে ওঠে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে কিংবা বৃষ্টিবাদলের দিনে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। চিলমারী উপজেলা সদরের সঙ্গে রাণীগঞ্জ ইউনিয়নসহ আশপাশ এলাকার সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই পথটি বন্ধ থাকায় এখন বিকল্প পথে ৭-৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে বেশি বিপাকে পড়েছেন মুমূর্ষু রোগী ও অন্তঃসত্ত্বারা।
রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি আসতে না পারায় রোগীকে দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
যোগাযোগের এই বেহাল অবস্থায় লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। মাহমুদুল হাসান জানান, সেতু না থাকায় মালবাহী ট্রাক সরাসরি দোকানে আসতে পারে না। খালের অপর পাড়ে মাল আনলোড করে ছোট ছোট যানবাহনে দোকানে আনতে পরিবহন খরচ হচ্ছে দ্বিগুণ। স্থানীয় বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুই বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করলেও সেতুর কাজ কবে শেষ হবে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
গাফিলতির কারণ হিসেবে বাস্তবায়নে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ ‘দক্ষ মিস্ত্রির অভাবের’ অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। তবে সাড়ে ১০ কোটি টাকার মতো বড় প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল ছিল কিনা, তদারক না করেই কাজ হস্তান্তর করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে যোগাযোগের জন্য অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খাইরুল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার লেলিনের ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. জুলফিকার আলী অবশ্য বিলম্বের কথা স্বীকার করে জানান, সেতুটির নকশা কিছুটা ব্যতিক্রমী হওয়ায় বিশেষ দক্ষ মিস্ত্রির প্রয়োজন পড়েছিল। সেই দক্ষ মিস্ত্রি না পাওয়ায় কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। পুনরায় কাজ শুরু হয়েছে এবং খুব দ্রুত বাকি কাজ শেষ করা হবে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। জবাবে তারা সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে এবং বিষয়টি বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন।
- বিষয় :
- নকশা