হবিগঞ্জের মাধবপুর
আউশের দাম নিয়ে হতাশ কৃষক
ছবি: ফাইল
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩১ | আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১৭
আউশ মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার কৃষক। আউশ মৌসুমে সরকারি উদ্যোগে ধান সংগ্রহ না হওয়া এবং বাজারে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ধানের দাম আরও কমেছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
কৃষকরা বলছেন, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুত, সেচ, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত ধানের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। বর্তমানে প্রতি মণ আউশ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের। ফলে ভালো ফলন পেয়েও লাভের মুখ দেখছেন না তারা।
তেলিয়াপাড়ার কৃষক মো. আমজাদ বলেন, ‘ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ফলন ভালো হলেই কৃষকের লাভ হয় না। ধান উৎপাদনে যে টাকা খরচ হচ্ছে, বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা তুলতে পারছি না। সার-কীটনাশকের দাম ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। এ ছাড়া ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচও বেড়েছে। অথচ ধানের দাম বাড়েনি।’
মাধবপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ৬ হাজার ৮১২ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মাঠজুড়ে ভালো ফলন দেখা যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৭ টন ফলন হতে পারে বলে আশাবাদী কৃষি কর্মকর্তারা।
উপজেলার ধর্মঘর এলাকার কৃষক আমির আলী জানান, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি সব মিলিয়ে ধান আবাদে কৃষককে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কাটতেই হারভেস্টারে প্রায় দুই হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাতের খরচও যোগ হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান ঘরে ওঠার পরপরই মৌসুমি ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। উৎপাদন খরচের চাপ ও নগদ টাকার প্রয়োজন থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের চাপ থাকায় ধান মজুত করে রাখার সুযোগও থাকে না। এ সুযোগে ফড়িয়ারা কম দামে ধান কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন।
কৃষক শহীদ মিয়া বলেন, কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহিত করতে শুধু প্রণোদনা বা পরামর্শ দিলেই হবে না। আউশ মৌসুমে সরকারি ধান কেনা না হলে বাজারে দাম কমে যায়। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করবে না কেন ?
আরেক কৃষক কায়সার বলেন, ‘কয়েক বছর আগে ধানের দাম এত কমে গিয়েছিল যে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন আবার যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন। কৃষক ধান চাষ ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে দেশে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষককে শুধু উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়। কিন্তু উৎপাদনের পর ধান বিক্রি করে কৃষকের হাতে কত টাকা থাকে, সেই হিসাব কেউ রাখে না। উৎপাদন খরচ, শ্রম ও পরিবারের ভরণপোষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ধানের দাম নির্ধারণ করা দরকার।’
মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার বলেন, সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ বছর আউশের ফলন ভালো হয়েছে এবং মাঠে ভালো ফলন দেখা গেছে। তবে দাম নিয়ে কৃষকরা খানিকটা হতাশ। কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা রেজাউর ইসলাম বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে ধান কেনা হয় না। বাজারে ধানের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে খাদ্য বিভাগের সরাসরি তেমন কোনো ভূমিকা নেই।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন, এবার আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে বড় আকারে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভর্তুকিতে হারভেস্টার মেশিন দেওয়া হয়েছে। কৃষক যাতে উৎপাদিত ধানের ভালো দাম পান, সে বিষয়েও মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।