ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

কথিত সততায় প্রশংসা কুড়াচ্ছেন ইউএনও, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র

কথিত সততায় প্রশংসা কুড়াচ্ছেন ইউএনও, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র
×

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনার ডুমুরিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্প খাল খনন বাস্তবায়ন ভেস্তে গেছে। উপজেলার দুটি খাল খনন না হওয়ায় লাখো মানুষ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। খুলনা জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রকল্পের এক কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য হন ইউএনও সবিতা সরকার। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। 
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডুমুরিয়া উপজেলায় তিনটি খাল খননে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়। তিনটি খালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দুটি খাল খননের জন্য দুই কোটি ৫৮ লাখ ৯১ হাজার ৭৩১ টাকা বরাদ্দ দেয়। রঘুনাথপুর ইউনিয়নের বিলডাকাতিয়াসংলগ্ন কৃষ্ণনগর নিমতলা থেকে রংপুর সাড়াতলা পর্যন্ত পুর্নখনন। খালের দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার। খালটি খননে ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ ১১ হাজার ৮৪৩ টাকা। অন্যটি হচ্ছে উপজেলার সাহস ইউনিয়নের ডোলভাঙ্গা থেকে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া হয়ে তেলিখালী স্লুইসগেট অভিমুখে ভদ্রা নদী পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার খাল পুনর্খনন। এ কাজের ব্যয় ধরা হয় এক কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে ইজিপিপি, অর্থাৎ অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন খাল দুটি পুনর্খননের কার্যক্রম শুরু করে।         

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশন না করেই ভাসমান ভেকু (এক্সক্যাভেটর) দিয়ে খালের নিচের কিছু কাদামাটি তুলে পাড়ে রাখা হয়। বৃষ্টিতে ওই মাটি আবার খালেই ভেসে যায়। ফলে খাল ভরাট হয়ে আবারও পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ডুমুরিয়ার কয়েক লাখ মানুষের। 
জানা গেছে, দুটি খাল খননে এক কোটি ২২ লাখ ৯১ হাজার ৭৩১ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কম খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে খালের পানি ঘোলা করেই খননকাজ দেখানো হয়েছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির সুফল ভেস্তে গেছে। খাল খননে শ্রমিকদের কাজ না নিয়ে ইউএনও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত এক কোটি এক লাখ ২৯ হাজার টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। 

রংপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক মহাদেব মণ্ডল, কৃষক সুদেব মণ্ডল এবং মাছ চাষি সঞ্জয় মল্লিক বলেন, নিমতলার খালটি এক বছর আগে খনন করা হয়েছিল। নতুন করে খননের আগে এই খালে ১২ থেকে ১৫ ফুট পানি ছিল। ওই পানির মধ্যেই ভাসমান ভেকু দিয়ে কোনোমতে খালের কিছু নরম মাটি, কচুরিপানা এবং খালের দুই পাড়ে সেভ (চেঁছে) করে খাল পুনর্খনন দেখানো হয়েছে। খালের দুই পাড়ের যে মাটি দেখা যাচ্ছে, তা খাল খননের নয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে ওই খালের পাড়ে সামান্য বেড়িবাঁধ দিয়ে কিছু গাছের চারা রোপণ করে শোভাবর্ধন করা হয়েছে। ফলে খাল পুনর্খননের জন্য যে টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে, তার এক-তৃতীয়াংশও খরচ হয়নি।
সম্প্রতি খাল খননকাজ পরিদর্শনে আসেন ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী বর্মণ। এ সময় প্রকল্পকাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কাজের নকশা অনুযায়ী খালের পানি অপসারণ করে খননের নির্দেশনা দেন তিনি। কিন্তু ওই নির্দেশনা অনুযায়ী খাল পুনর্খনন করতে ব্যর্থ হন ইউএনও। 
নিমতলা-কৃষ্ণনগর খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রঘুনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনোজিত বালা বলেন, খাল পুনর্খনন কাজ মোটামুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর যতটুকু কাজ করা সম্ভব হয়নি, সেই অর্থ সরকারের কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন ইউএনও। 

এদিকে সাহস ডোলডাঙ্গা খাল থেকে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া খাল হয়ে ভদ্রা নদীর অভিমুখে খাল পুনর্খনন প্রকল্পের স্লুইসগেটের সামনে খননের মাটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। নামমাত্র একটি বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়েছে, যার দক্ষিণ পাশেও পানিতে নিমজ্জিত। এর মাঝখানের বেড়িবাঁধে রোপণ করা গাছের চারা এখন পানির নিচে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সাহস ইউপি সদস্য শেখ শফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের অর্থ ফেরত যাওয়ার বিষয়টি কিছুই বলতে পারেন না। এ বিষয়ে ইউএনও ভালো বলতে পারবেন।      
সাহস ইউনিয়নের বাগদারি গ্রামের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইয়াসিন আরাফাত ও ভান্ডাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ডুমুরিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক খান জিয়াউর রহমান জীবন বলেন, সামাজিক মাধ্যমে দেখছি ডুমুরিয়া ইউএনও সরকারের কোষাগারে টাকা জমা দিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন। এটা এক ধরনের প্রতারণা। তাদের ভাষ্য, খাল খননের নামে এখানে হরিলুট হয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফ হোসেন জানান, দুই সপ্তাহ আগে তিনি ডুমুরিয়া যোগ দিয়েছেন। দুটি খাল পুনর্খননের বিষয়ে কিছুই বলতে পারবেন না তিনি। 
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  সবিতা সরকার বলেন, খাল খননকাজে কোনো দুর্নীতি হয়নি। নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে। আর নানা জটিলতার কারণে দুটি খালেরই কিছু অংশ খনন করা সম্ভব হয়নি। ফলে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রকল্পের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×