ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

উন্মুক্ত খনির প্রস্তাবে আবার ফুঁসে উঠছে ফুলবাড়ীবাসী

উন্মুক্ত খনির প্রস্তাবে আবার  ফুঁসে উঠছে ফুলবাড়ীবাসী
×

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্ণ হলেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব বাতিলসহ চুক্তির মূল দাবিগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় আবার ফুঁসে উঠছে ফুলবাড়ীবাসী। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর উন্মুক্ত খনি নিয়ে দেওয়া মন্তব্যের জেরে নতুন করে শঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মনে। 

চাষযোগ্য কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সঙ্গে করা ঐতিহাসিক ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে এবারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিনটি পালনের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ফুলবাড়ি ট্র্যাজেডির ২০ বছর আগের সেই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে বসতভিটা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার এই লড়াইয়ে আজ বুধবার আবার এককাট্টা হচ্ছে পুরো এলাকা। 

জেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই খনি অধ্যুষিত এলাকায় ৫৭২ মিলিয়ন টন উচ্চমানের কয়লার স্তূপ পেয়েছিল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি। তবে চাষযোগ্য ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ও হাজার হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করে উন্মুক্ত খনি বাস্তবায়নের প্রস্তাবের প্রতিবাদে ২০০৬ সালে রাজপথে নেমেছিল স্থানীয় জনতা। ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে মিছিলে গুলিবর্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম ও সালেকিন প্রাণ হারান। এরপর শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের কঠোর হরতাল ও অবরোধে অচল হয়ে পড়েছিল পুরো উত্তরাঞ্চল। বাধ্য হয়ে তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছয় দফা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তিতে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, উন্মুক্ত কয়লাখনি বন্ধ, নিহতদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা, শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল।

গত দুই দশকে আংশিকভাবে কিছু ক্ষতিপূরণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেলেও মূল দাবিগুলো রয়ে গেছে উপেক্ষিত। আন্দোলনকারী নেতাদের অভিযোগ, স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও গণদাবিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। 

তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘যে ছয় দফা চুক্তির জন্য আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছেন, সেই চুক্তি বাস্তবায়নে বিগত স্বৈরাচারী সরকার গড়িমসি করেছে। বর্তমানে স্বৈরাচারী শাসনের পতন হয়েছে। নতুন বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের আকুল দাবি– আপনারা বিগত সরকারের ভুল নীতি থেকে সরে আসুন এবং গণমানুষের দাবি অনুযায়ী অবিলম্বে ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুন। জাতীয় সম্পদ জনগণের, কোনো বহুজাতিক লুটেরাদের হাতে তা তুলে দেওয়া যাবে না।’
খনি আন্দোলনের নেতা এম এ কাইয়ুম আনসারী বলেন, প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং ৫ হাজার ৯০০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি চিরতরে বিলীন করে এখানে কোনো কয়লা খনি হতে দেওয়া হবে না। এই মাটি ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। 

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতাসহ স্থানীয় সাবেক মেয়র মাহমুদ আলম লিটন এবং বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ মো. খুরশিদ আলম মতি একসুরে জানান, ফুলবাড়ীর উর্বর কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা করে ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলের মানুষ মেনে নেবে না।

দুই দশকের পঙ্গুত্ব ও অবর্ণনীয় যন্ত্রণা
ঐতিহাসিক এ আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে পঙ্গুত্ব বরণকারী বাবলু রায়ের মতো অসংখ্য আহত মানুষের জীবন। ২০০৬ সালের মিছিলে গুলিবিদ্ধ সুজাপুর গ্রামের এই রিকশাভ্যান চালক দীর্ঘ চিকিৎসাতেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। শরীরের নিম্নাংশ অবশ ও কোমরে ঘা নিয়ে হুইলচেয়ারেই কাটছে তাঁর দিন। আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে সঠিক চিকিৎসা এবং সন্তানদের লেখাপড়া। শয্যাশায়ী বাবলু রায়ের আকুল আকুতি– মৃত্যুর আগে হলেও তিনি ছয় দফা চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন দেখে যেতে চান।
এদিকে আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে বিভিন্ন  সংগঠনের উদ্যোগে ফুলবাড়ীতে শোক র‌্যালি, শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় নিমতলা মোড়ে জাতীয় কমিটির উপজেলা আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ।

আরও পড়ুন

×