হাওরে চাঁদাবাজি, জেলেদের মারধরের অভিযোগ
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৩ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে হাওরে মাছ শিকারে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। প্রথম দফায় ৩০ হাজার টাকা দিয়ে মাছ শিকার করেন জেলেরা। এরপর আরও ৭০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন, কিন্তু দাবি করা হয় দুই লাখ টাকা। এতে রাজি না হয়ে আগের টাকা ফেরত চাইলে জেলেদের মারধর করা হয়। তাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র ও দুটি নৌকা লুট করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। গত ২৬ আগস্ট রাতে বিশুরীকান্দা হাওরে এই ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলেদের পক্ষে মুজিবুর রহমান নামে একজন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওসি নাসির উদ্দিন।
জানা গেছে, গত ২৬ আগস্ট রাতে মেন্দিপুর ইউনিয়নের বিশুরীকান্দা এলাকায় হাওরে মাছ ধরতে গেলে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের মারধর, মাছ ধরতে বাধা এবং দুটি নৌকা, তিনটি স্মার্টফোন, তিনটি বাটন ফোন ও নগদ টাকা লুট করা হয়। এই ঘটনায় বলরামপুর গ্রামের জেলে মুজিবুর রহমান খালিয়াজুরী থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে মেন্দিপুর ইউনিয়নের বানুয়ারী গ্রামের আল আমিন চৌধুরী, আলী হোসেন, সারোয়ার চৌধুরী ও নয়ন মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় ২৪টি পরিবার দীর্ঘদিন খালিয়াজুরীর হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। সম্প্রতি বিশুরীকান্দা এলাকায় মাছ ধরতে গেলে বাধা দেন আল আমিন চৌধুরী, আলী হোসেনসহ অভিযুক্তরা। সেখানে মাছ ধরতে হলে টাকা দিতে হবে বলে জানান। জেলেরা প্রথমে আল আমিন চৌধুরী ও আলী হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা দেন। কিছু দিন পর আবার সেখানে মাছ ধরতে গেলে আরও ৭০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। জীবিকার তাগিদে সেই টাকাও দেওয়ার প্রস্তুতি নেন জেলেরা।
অভিযোগকারীর দাবি, গত ২৬ আগস্ট রাত ৯টার দিকে ১৮ জন জেলে দুটি নৌকা নিয়ে বিশুরীকান্দা এলাকায় মাছ ধরতে গেলে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। জেলেরা নতুন করে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আগের টাকা ফেরত চাইলে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে আল আমিন ও আলী হোসেনের নেতৃত্বে জেলেদের মারধর করে নগদ এক হাজার ৬০০ টাকা, তিনটি স্মার্টফোন ও তিনটি বাটন ফোন লুট করে নিয়ে যায়। এসবের আনুমানিক মূল্য ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া জেলেদের দুটি নৌকাও নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন মুজিবুর রহমান। তাঁর দাবি, নৌকা দুটির আনুমানিক মূল্য দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা।
মুজিবুর রহমান বলেন, তারা মাছ ধরেই সংসার চালান। মাছ ধরতে গেলেই বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয় এবং টাকা দাবি করা হয়। ঘটনার রাতে তাদের কাছে টাকা দাবি করার পাশাপাশি নৌকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে অভিযুক্তরা। এই ঘটনার বিচার চান তারা।
শহীদুল্লাহ নামে অন্য জেলে জানান, বোয়ালী গ্রামের মিলন মিয়ার সামনেই তাদের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন অভিযুক্তরা। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি ৭০ হাজার টাকা ২৬ আগস্ট রাতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই রাতে বিশুরীকান্দায় মাছ ধরতে গেলে আল আমিন ও আলী হোসেনের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এতে আপত্তি জানিয়ে আগের ৩০ হাজার টাকা ফেরত চাইলে মারধর শুরু করে। দুটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও জালসহ সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
অভিযুক্ত আল আমিন মিয়া বলেন, ‘আমি আগড়ডুবি জলমহালের অংশীদার। আসল মালিক আলী হোসেন।’ জেলেদের কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ফিশারির পাশে বলরামপুরের জেলেরা মাছ ধরতে গেলে বাধা দেই। আমি বলছি এই ফিশারিতে আমাদের অনেক ক্ষতি হইছে, এখানে যদি মাছ ধরতে হয় তাহলে আমাদের কিছু হাদিয়া দিতে হবে। আমাদের কথা না মেনে মাছ ধরতে চাইলে তাদের জাল, ইঞ্জিনচালিত দুটি নৌকা, দুটি স্মর্টফোন ও দুটি বাটন ফোন নিয়ে আসছি। থানার দারগা আসছিলেন আমি স্বীকার করেছি। বলছি তারা আসলে ওই জিনিস ও নৌকাসহ দিয়ে দিব।’
আলী হোসেন বলেন, ‘ফিশারিটা মূলত সাতগাঁওয়ের মেম্বার শফিকুল ইসলামের। তাঁর লোক রব্বানীর কথায় এটা আমি দেখাশোনা করি। আমি আষাঢ় মাসে থেকে বলরামপুরের জেলেদের না করছি এই এলাকায় মাছ ধরতে। কিন্তু তারা কোনো কথা শোনে না। তারা বলে বোয়ালীর মিলন মিয়া ও পপুলার মিয়ার সঙ্গে রফাদফা হইছে।’
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামানের ভাষ্য, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে কোনো বাধা নেই। তবে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরার বিধিনিষেধ চলমান প্রক্রিয়া। বিষয়টি তাঁকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন কেউ একজন। তাঁকে ওসির কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে, সম্ভবত অভিযোগ করেছেন। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়মিত মামলা হবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, খালিয়াজুরীর হাওরে মাছ শিকারে এক মাসের নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন আর সেই নিষেধাজ্ঞা নেই। বেড়জাল দিয়ে মাছ ধরতে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
খালিয়াজুরী থানার ওসি নাসির উদ্দিনের ভাষ্য, মাছ ধরার জাল ও নৌকা লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। জেলেদের দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ অন্যান্য সামগ্রী ফেরত দিয়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন অভিযুক্তরা।
- বিষয় :
- চাঁদাবাজি