মোংলা বন্দর এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন
বিনা ভোটের নির্বাচনে সম্পাদক হলেন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ভাই
খুনের আসামি ছিলেন মাহামুদুন চৌধুরী জনি
ছবি: সংগৃহীত
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনা নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে গত ৪ মার্চ গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে। শত শত মানুষের উপস্থিতিতে ওই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে আঁতকে ওঠে মানুষ।
মামলার তদন্ত চলাকালে গত ১৪ জুন রাতে খুলনার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় তার ভাই মাহামুদুন চৌধুরী জনিকে। মামলাটিতে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে দাবি করে ওই হত্যা মামলায় তাকে রিমান্ড নেওয়া হয়। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জনি। গতকাল শনিবার মোংলা বন্দর এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। এর পরই এ ঘটনা জানাজানি হয়।
অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন ছিল গত ২৩ মে। গোপনে সেই ভোটের আয়োজন করা হয়। তবে প্রতিটি পদে একজন করে প্রার্থী থাকায় সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর জনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় তিন মাস পরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো। শুধু একটি প্যানেলের সদস্যরাই মনোনয়নপত্র কেনেন। প্যানেলের নেতৃত্বে জনি থাকায় সাধারণ কোনো ব্যবসায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস পাননি। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনা মহানগর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মুজিবর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিটি পদে একজন করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেন। কেউ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় সবাইকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হয়। অ্যাসোসিয়েশনে কিছু সমস্যা থাকায় গতকাল শনিবার তাদের শপথ পড়িয়েছি।
শপথ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পী, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ।
অ্যাসোসিয়েশন দখল
২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল সংগঠনটি। ওই বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের হস্তক্ষেপে ভোট ছাড়াই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হন বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ লিয়াকত হোসেন। সভাপতি হিসেবে সুলতান হোসেন খানকে বহাল রাখা হয়। টেন্ডার সিন্ডিকেট, পণ্য চুরি, স্বর্ণ চোরাচালানসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন লিয়াকত। তাঁর দাপটে কোণঠাসা ছিলেন অন্য সদস্যরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আত্মগোপনে চলে গেলে সংগঠনের কাজেও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের প্ররোচনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকর্মী সিঅ্যান্ডএফ ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন।
অচলাবস্থা নিরসনে ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর প্রবীণ ব্যবসায়ীরা কেসিসির সাবেক মেয়র ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিকে আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ২০ নভেম্বর বিএনপি সমর্থিত অন্য ব্যবসায়ীরা মোশাররফ হোসেনকে আহ্বায়ক এবং মাহামুদুন চৌধুরী জনিকে সদস্য সচিব করে আরেকটি কমিটি করে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সময় মাহামুদুন চৌধুরী জনি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যই ছিলেন না। তিনি অন্য ফার্মের কাজ করতেন। ওই সময় জনির এক ভাই ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং আরেক ভাই ছিলেন খুলনা মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইশতিয়াক আহমেদ। জনিকে সামনে নিয়ে আসায় অন্য ব্যবসায়ীরা পিছু হটেন।
মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি
২০২৪ সালে ১১ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনার বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ৯১ জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়। মামলায় মনিরুজ্জামান মনিকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির তিন সদস্যকে আসামি করা হয়। তিনজনই বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এর মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মনিরুজ্জামান মনি বর্তমানে খুলনা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অচলাবস্থা নিরসনের জন্য ওরা এসেছিল। মবের কারণে ওই কমিটি কাজ করতে পারেনি। সব মনে নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলায় হয়রানির শিকার দুই ব্যবসায়ী বলেন, অনেক কষ্টে এর থেকে নিস্তার পেয়েছি। এর পর কোনো দিন অ্যাসোসিয়েশনে যাইনি। আর যাবও না।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররাই আমাদের চেয়ারে বসিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন দিয়েছি। আগের কমিটির এখনও বহাল রয়েছে– দাবি করে আদালতে মামলা করেছিল। দুটি মামলাতেই আমরা জিতেছি।
মাহামুদুন চৌধুরী জনি বলেন, ‘পুলিশ সন্দেহভাজন হয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। এজাহারে আমার নাম নেই। বাদী আদালতকে বলেছেন, আমি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নই। মামলা ওখানেই শেষ।’ তবে মাসুম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই জামাল উদ্দিন বলেন, এ রকম কিছু আমার জানা নেই।
- বিষয় :
- মোংলা বন্দর