ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাত নামলেই পোড়ানো হয় শত শত পুরোনো ব্যাটারি

রাত নামলেই পোড়ানো হয় শত শত পুরোনো ব্যাটারি
×

পদ্মা নদীর তীরে গভীর রাতে পোড়ানো হচ্ছে পুরোনো ব্যাটারি। গত শুক্রবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সাদিপুর নৌকাঘাট এলাকায় সমকাল

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দিনের বেলা পদ্মাতীরের সাদিপুর নৌকাঘাটের পাশের এলাকাটি সুনসান। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেই শুরু হয় বিপুল কর্মযজ্ঞ। দিনে সবুজ রঙের ত্রিপলে ঢেকে রাখা শত শত পুরোনো ব্যাটারি রাতে উন্মুক্ত স্থানে ভাঙা হয়। সেগুলো কয়লা-কাঠের আগুনে পুড়িয়ে বের করা হয় সিসা। পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর এই বিষাক্ত সিসা সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে প্রায় দুই মাস ধরে। 
এলাকাবাসীর কাছে অভিযোগ পেয়ে গত শুক্রবার বিকেল ও মধ্যরাতে সরেজমিনে এসব দৃশ্য দেখা যায়। সাদিপুর নৌকাঘাট­­­-সংলগ্ন এলাকাটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়নে পড়েছে। তবে নদীর ওপারের পাবনার বাসিন্দা মনির হোসেন এই কারখানার মালিক। 

এলাকাবাসীর ভাষ্য, পুরোনো সিসা-এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানাটি অপরিকল্পিত ও অনিরাপদভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। নেওয়া হয়নি কোনো দপ্তরের অনুমতিও। কারখানা থেকে নির্গত সিসাযুক্ত ধোঁয়া, দূষিত ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থ মিশছে মাটি, পানি ও বাতাসে; যা স্থানীয় পরিবেশ ও জনসাধারণের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রকাশ্যে কারখানাটি পরিচালিত হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। 

কারখানাটির কাছেই একটি ইটভাটা রয়েছে দেলোয়ার হোসেনের। তাঁর ভাষ্য, পাবনার বাসিন্দা মনির হোসেন স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের হাত করে নিয়েছেন। মাসে লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করছেন। এতে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে। বারবার নিষেধ করার পরও বন্ধ হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিকের ভাষ্য, প্রায় দেড় মাস ধরে কাজ করছেন এখানে। তারা বিস্তারিত জানতে কারখানা মালিক মনির হোসেনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। 
মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কল দেওয়া হলে মনির হোসেন অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, সবাইকে ম্যানেজ করেই দেড় মাস ধরে চলছে কারখানা। তবে বাতাসের কারণে অধিকাংশ দিনই বন্ধ রাখতে হয়। ব্যবসায় লাভও হচ্ছে না।

স্থানীয় এক কৃষক বলেন, দিনের বেলায় এখানে কোনো কাজ হয় না। রাত সাড়ে ১১টার পরে ট্রাকভর্তি করে মাল (পুরোনো ব্যাটারি) আসে। আর ১২টার দিকে জ্বালানো হয় আগুন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, কারখানা মালিককে স্থানীয়ভাবে প্রশ্রয় দেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা, বিএনপি কর্মী জালাল ও হযরত। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীসংলগ্ন এলাকার কলা, সবজিসহ সব ধরনের ফসলের ক্ষতি হবে বলেও জানান তিনি। 

প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান টিক্কা। তিনি বলেন, ‘কারা কী করতেছে জানি নে। আমি এসবে নেই। আপনারা মনিরের সঙ্গে মিলতাল করে নেন।’
এই কারখানার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন–এমন মন্তব্য করেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজম। তাঁর ভাষ্য, দিন পনেরো আগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কারখানার লোকদের দৌড়ানি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলে কিনা–তা জানা নেই।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার বলেন, শিগগিরই প্রশাসন অবৈধ ব্যাটারি কারখানায় অভিযান চালাবে। 
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট হাবিবুল বাসার মোবাইল ফোনে বলেন, ব্যাটারির ভেতরে সালফিউরিক এসিড থাকে। উন্মুক্তভাবে এসব ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করলে বাতাসে সিসা ও লেডের পরিমাণ বেড়ে যায়; যা পরিবেশ ও মাটির জন্য খুবই ক্ষতিকর।
 

আরও পড়ুন

×