ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিবির নেতাকে ছাত্রদল নেতার থাপ্পড়, রামদা নিয়ে মহড়া, ভাঙচুর ও সমঝোতা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

শিবির নেতাকে ছাত্রদল নেতার থাপ্পড়, রামদা নিয়ে মহড়া, ভাঙচুর ও সমঝোতা
×

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৩:২৮

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে থাপ্পড় মারাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে হামলা, মারপিট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিলে ক্যাম্পাসজুড়ে থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন প্রবেশপথে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে অবস্থান ও মহড়া দিতে দেখা যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমাধান হয়নি। পরে রাত ৮টার দিকে প্রক্টর কার্যালয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে ফের আলোচনা হয়। বৈঠকে ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কমিটিতে লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিমকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বৈঠকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ এবং সব ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বিভাগ অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের সিট বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুর দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে থাপ্পড় মারেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য আলীনূর রহমান। জুহায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এবং আলীনূর আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। থাপ্পড় দেওয়ার পর আলীনূর হলের নিজ রুমে চলে যান। এর পরপরই শিবির নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে আসেন। এরপর তারা আলীনূরের রুমের দিকে গেলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা ভেতর থেকে রুমের দরজা বন্ধ পেয়ে জানালার কাচ ভাঙচুর করেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। বিষয়টি সমাধানে উভয়পক্ষের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে হল অফিসে আলোচনায় বসানো হয়। পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা অলীনূরকে হলের রুম থেকে বের করতে গেলে শিবির কর্মীদের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। এরপর ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ সভাস্থল ত্যাগ করেন। ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ আলীনূরকে বের করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় আলীনূরকে প্রক্টরিয়াল বডির গাড়িতে তুলতে গেলে শিবির কর্মীরা তাঁর ওপর চড়াও হন। এ সময় তাঁকে কিল-ঘুসি মারা হয়। গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। 
ঘটনার পরপরই বিকেল চারটার দিকে গাড়ি আটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রদল। সেখানে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে বহিরাগতদের মহড়া দিতে দেখা যায়। একইসময়ে লাঠিসোটা হাতে জিয়া মোড়ে অবস্থান নেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ছাত্রদল প্রধান ফটক খুলে দেয়। তারা ফটকের সামনে অবস্থান নেয়। স্থানীয় কয়েকজন জামায়াতকর্মী প্রধান ফটকে এলে তাদের ওপর হামলা করা হয়। এতে শহীদুল ও বাবুল নামে দুই জামায়াতকর্মী আহত হন। তাদের হরিনারায়ণপুর চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সন্ধ্যার পর প্রধান ফটক দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে মূল ক্যাম্পাসে ঢুকতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তারা ক্যাম্পাসে ঢোকেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড়, লালন শাহ হল পকেট গেট ও আজিজ হল পকেট গেটে অবস্থান নেন স্থানীয় জামায়াত ও শিবির কর্মীরা।  
      
কাজী জুহায়ের বলেন, ‘আমি আজ পরীক্ষা শেষে এক বন্ধুর সঙ্গে হলে যাচ্ছিলাম। আমার পায়ের লিগামেন্টে সমস্যার কারণে ক্রাচে ভর করে আস্তে আস্তে যাচ্ছিলাম। এ সময় আলীনূর আচমকা এসে আমাকে থাপ্পড় মারতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো বিরোধও ছিল না। কেন তিনি এই কাজ করেছেন তা আমি জানি না। আমি হতভম্ব হয়ে তাঁকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তুই বেয়াদব, তাই মারছি। যা পারিস করিস।’ 

আলীনূর রহমান বলেন, ‘আমি তার (জুহায়ের) পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে বেয়াদব বলি। পরে তিনি আমাকে গালি দেন। এ সময় আমি তাঁকে থাপ্পড় দেই। তবে তাঁর সঙ্গে আমার আগের কোনো সমস্যা ছিল না।’ 

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এরপরও ছাত্রদল দেশীয় অস্ত্রসহ স্থানীয়দের নিয়ে মেইনগেটে অবস্থান নেয়। স্থানীয় জামায়াত কর্মীদের ওপর হামলা করে আহত করে। তবে আমরা এখন ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন বলেন, ‘ঘটনা জানতে পেরে আমরা সমাধানের উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষকে নিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসি। কিন্তু শিবিরের পক্ষ থেকে সমাধানের পথে না গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে হলের বাইরে আমাদের সদস্য সচিবকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। পরে আমরা সেখান থেকে চলে আসি। পরে প্রক্টর অফিসে উভয়পক্ষের আলোচনায় তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রশাসন তদন্ত করে বিষয়টি দেখবে।’

প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, পুলিশের সহযোগিতায় অভিযুক্তকে নিরাপদে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসি। উভয় পক্ষকে নিয়ে ঘটনা সমাধান করার চেষ্টা চলছে।
কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘এখানে দুই পক্ষের মাঝে একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা গিয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি। বর্তমানে একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারপরও আমরা এখানে থাকছি যাতে পরে এটা আরও উত্তপ্ত না হয়।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছি। এ ছাড়া হল প্রশাসনকেও আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্তের আলোকে প্রশাসন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ক্যাম্পাসে যেন কোনো বহিরাগতকে প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

আরও পড়ুন

×