ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডুবুরি সংকটে উদ্ধারে ধীরগতি, মৃত্যু বাড়ছে

ডুবুরি সংকটে উদ্ধারে ধীরগতি, মৃত্যু বাড়ছে
×

এ কে এস রোকন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধুদের সঙ্গে ভরা পদ্মায় গোসলে নেমেছিল সোহান (১০)। তার হাতে থাকা একটি প্লাস্টিকের বোতল হঠাৎ ফসকে যায়। সেটি ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যায় শিশুটি। গত শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুরে দুর্ঘটনার শিকার হয় সে। অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 
সোহান উপজেলার উত্তর উজিরপুর সাত্তার এলাকার সেলিম রেজার ছেলে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। সেলিম রেজার বাড়ির পাশেই পদ্মা নদী। তিন দফায় ভাঙনে বাড়ি হারিয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সাত্তার মোড়ে ভাড়া করা জমিতে অস্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। কাঁদতে কাঁদতে সেলিম বলেন, বাড়িঘর খেয়ে নেওয়ার পর ছেলেকেও খেয়ে নিয়েছে রাক্ষুসে পদ্মা। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাস্থলের মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। সেখানে কোনো ডুবুরি না থাকায় তাঁর ছেলের জীবনে এই স্টেশন কোনো কাজে আসেনি।

পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা, পুনর্ভবা নদী ঘেরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আয়তন প্রায় ১৭০০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৮ লাখ ৩৫ হাজারের মতো। গোসলে নেমে, মাছ ধরতে গিয়ে, নৌকায় পারাপারের সময় বা নদীর চরে খেলতে গিয়ে এই জনপদে নানা বয়সী মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। জেলায় কোনো ডুবুরি দল না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলেও উদ্ধার অভিযান ঘটে দেরিতে। রাজশাহী থেকে আসা ডুবুরি দলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় স্বজনের। উদ্ধারকাজের এই ধীরগতি ও সক্ষমতাহীনতায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা জেলায় দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালু ও এমন দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে পানিতে ডুবে মারা গেছেন ৪৭ জন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মারা গেছে আরও দুজন। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত জানুয়ারিতে ছয়জন, ফেব্রুয়ারিতে একজন, মার্চে চারজন, এপ্রিলে তিনজন, মে মাসে পাঁচজন ও জুনে পাঁচজন মারা গেছেন। জুলাই-আগস্টে নদনদীর পানি বাড়ে। এই দুই মাসে মারা গেছেন ২৩ জন। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১১ জন ও আগস্টে সর্বোচ্চ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

গত ৩০ জুন দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলীমনগর ঘাটে পদ্মায় গোসলে নেমেছিল ছয় বন্ধু। কয়েক মিনিটের মধ্যে তীব্র স্রোত ও গভীর খাদে তলিয়ে যায় রিফাত আলী (১৬) ও রাসেল আলী (১৭)। অন্য চার বন্ধু কোনোমতে বেঁচে যায়। তাদের সবাই সুবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ত। এ দিন বিকেলে সদর উপজেলার রেহাইচরে মহানন্দায় মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন আজাইপুর আরামবাগের সাকিরুল ইসলাম (৩০)। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি নদীতে তিনজন তলিয়ে গেলেও উদ্ধারে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে ফায়ার সার্ভিসের দল। পরে রাজশাহী থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল আসে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রিফাত ও রাসেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন উদ্ধার হয় সাকিরুলের মরদেহ। 

একই সঙ্গে পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু
নদীতে তলিয়ে পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি জেলাজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। এ ঘটনাটি গত ২৮ আগস্টের। এদিন ছিল শুক্রবার। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা যখন জুমার নামাজে ব্যস্ত, তখনই ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী পাঁচ শিশু নেমেছিল সদর উপজেলার দেবীনগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা শাখা নদী মরা পদ্মায়। সবাই তলিয়ে যায়। 
দেবীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চর চাকলা গ্রামে নদীঘাটের এ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী শিশুরা হলো– ওই গ্রামের নেজামুদ্দিনের মেয়ে সুমাইয়া (১১) ও সুরাইয়া (১০), মাসুদ আলীর মেয়ে আরিবা (৮) ও সুমাইয়া (১০) এবং শরিফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা (৮)। তারা সম্পর্কে মামাতো, ফুপাতো ও চাচাতো বোন। তাদের চারজন চরচাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও একজন চরদেবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত। 

চরচাকলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য, তাঁর বিদ্যালয়ে যে চার ছাত্রী মারা গেছে, তাদের রোল নম্বর ছিল ১ থেকে ১০-এর মধ্যে। শান্ত ও মেধাবী মেয়েদের এই অকাল মৃত্যু পুরো বিদ্যালয়কে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সেদিন উদ্ধার অভিযানে দেরি হওয়ায় শিশুদের বাঁচানো যায়নি।

প্রশাসনের তথ্যে অসংগতি
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে। তবে জেলার পাঁচটি থানায় নথিভুক্ত অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলার তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় মোট ৭০টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা ৪৮টি।

কেন এই প্রাণহানি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পদ্মা নদীর জলপথ ৩৫ কিলোমিটার, মহানন্দার ৯৬ কিলোমিটার, পাগলার ৩৯ কিলোমিটার ও পুনর্ভবার ১৪ দশমিক ১২ কিলোমিটার। এ ছাড়াও ভাঙনের কারণে পদ্মার শাখা-উপশাখা ও মরা পদ্মা নামে অসংখ্য নালা বিস্তৃত। এসব নালা থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি লুট করে প্রভাবশালী চক্র। এসব কারণে সৃষ্ট শতশত গর্ত বর্ষায় তলিয়ে যায়। ফলে প্রকৃত গভীরতা নির্ধারণ সম্ভব হয় না। ভারী বৃষ্টিপাত ও ঢলের কারণে পানির উচ্চতা বাড়লে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। শুধু জুলাই-আগস্টে ২৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা এর প্রমাণ।
সচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, জেলার বেশির ভাগ নদীঘাটে কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট বা জরুরি উদ্ধার সরঞ্জামও নেই। নদীর কোথায় গভীর খাদ, কোথায় তীব্র স্রোত বা ঘূর্ণিপাক রয়েছে–সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার ব্যবস্থাও নেই। এসব কারণে তলিয়ে গিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্যসচিব মুনিরুজ্জামান মুনির বলেন, জেলায় ফায়ার সার্ভিসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা নেই। কেউ পানিতে ডুবে গেলে রাজশাহী থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালাতে হয়। অনেক সময় তাদের দেরি হয়। ততক্ষণে সন্তানদের খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হয়। 

এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক শেখ মো. মাহবুবুল ইসলাম। তাঁর দাবি, জেলায় স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালুর একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এটি অনুমোদন পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডুবুরি পাওয়া যাবে। 
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীবের মতে, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পাউবো ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত করে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, লাল পতাকা, লাইফ বয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত জরুরি। এমন কাজ পাউবো বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় করে না।
ভরা বর্ষার নদীতে সন্তানদের গোসলে পাঠানোর বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাঁতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সচেতনতামূলক সভা করতে হবে। নদী-নালা ও জলাশয়ের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাও চিহ্নিত করতে হবে।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গী বলেন, এ জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও এটিকে দেখতে হবে।

আরও পড়ুন

×