ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্ষমতার পালাবদলে দখলদার বদলায়, মুক্ত হয় না মাঠ

ক্ষমতার পালাবদলে দখলদার বদলায়, মুক্ত হয় না মাঠ
×

কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ধান ও সবজির হাট সমকাল

 এস এম কাওসার, বগুড়া

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

হাট শেষ হয়েছে। তার চিহ্ন রয়ে গেছে মাঠজুড়ে। কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পচা সবজি, কোথাও কাগজ, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা। ধুলা-কাদায় একাকার চারপাশ। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ব্যবহারে নোংরা হয়ে আছে শৌচাগারও। অথচ এই মাঠে পরদিন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অ্যাসেমব্লি, খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করার কথা।
বগুড়ার কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের এমন চিত্র দীর্ঘদিনের। সপ্তাহে দুদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসছে ধান ও সবজির হাট। এতে শুধু বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে না, ব্যাহত হচ্ছে পাঠদানও।

তিন যুগ ধরে চলে আসা এই হাটে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদলায়নি স্থান। আগে (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ নেতা ইজারা নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসিয়েছেন, এখন ইজারা নিয়েছেন বিএনপি নেতা। অর্থাৎ, ইজারাদার বদলেছে কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাঠটি দখলমুক্ত হয়নি।
কাহালু উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে দুর্গাপুর বাজার। স্থানীয়দের দান করা ৫৩ শতক জমিতে ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির জমির একটি বড় অংশ খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সপ্তাহের মঙ্গলবার ও শুক্রবার সেই মাঠে বসে হাট। সকালে বসে ধানের বাজার, বিকেলে সবজির। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।
স্থানীয় কৃষকেরা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও ভটভটিতে করে ধান-সবজি নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম ও যানবাহনের ভিড়। এতে পাঠদানের সময় শ্রেণিকক্ষেও পৌঁছে যায় হাটের শব্দ।

শিক্ষার্থীরা জানায়, ‘হাট বসার সময় শ্রেণিকক্ষে পড়ায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মাঠে খেলাধুলা বা অ্যাসেমব্লি করা যায় না।
কয়েকজন শিক্ষক জানান, হাটের দিন ক্রেতা-বিক্রেতাদের হই চইয়ে পাঠদানে বিঘ্ন ঘটে। ধুলাবালি ও ময়লা-আবর্জনায় বিদ্যালয়ের পরিবেশও নষ্ট হয়। হাটের পরদিন মাঠ পরিষ্কার করতেও সমস্যা হয়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। হাটুরে ও ব্যবসায়ীরা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বারান্দা, এমনকি শ্রেণিকক্ষেও ঢুকে পড়েন। তাদের অভিযোগ, মাঠে হাট বসার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের মাঠের দক্ষিণ পাশে থাকা শহীদ মিনারের অমর্যাদারও অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসানোর বিষয়ে শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ শুধু খালি জায়গা নয়; শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক কাজে মাঠ ব্যবহার হলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা ও খেলাধুলার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন দশক ধরে বিদ্যালয়ের মাঠে চলছে দুর্গাপুর হাট। বিগত (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন হাটটি ইজারা নিয়ে পরিচালনা করতেন। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে থাকায় চলতি বছরে ২৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক শাহিনুর রহমান।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসানোর কারণে সন্তানদের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। হাটটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য একাধিকবার বলা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, ‘আগে আওয়ামী লীগ নেতারা হাট বসিয়েছেন, এখন বিএনপি নেতারা বসাচ্ছেন। কিন্তু মাঠটি তো শিক্ষার্থীদের থাকার কথা।’
হাটের ইজারাদার বিএনপি নেতা শাহিনুর রহমান বলেন, ‘হাটের জায়গা সরকারি, বিদ্যালয়ের জায়গাও সরকারি। বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহারে স্থানীয় লোকজন কোনো দিন আপত্তি জানায়নি। কয়েক যুগ ধরে এখানে হাট বসে আসছে। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।’
প্রধান শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং গেট নির্মাণ করা হয়েছে। এরপরও হাট বসানো ঠেকানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠে হাট না বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মলিহা খানম বলেন, ‘আমি এ উপজেলায় যোগদানের পর কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি দেখব।’ প্রধান শিক্ষকের দাবি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×