বদলির নীতিমালায় বৈষম্যের ফাঁদ
ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষে চলছে পাঠদান সমকাল
শামীম আক্তার হোসেন, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বদলি কার্যক্রম শুরু হলেও নতুন নীতিমালার শর্তে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। যে নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষক সংকট দূর করা, বাস্তবে সেটিই অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আনুপাতিক হিসেবে বৈষম্য আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন শ্রীমঙ্গলের একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক থাকলে কিংবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি হলে সাধারণভাবে সেখান থেকে বদলির সুযোগ রাখা হয়নি।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র একেবারে ভিন্ন। শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। অথচ দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ৭০ জনেরও কম শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। আবার কোথাও কোথাও একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৭০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত। অর্থাৎ, একই ব্যবস্থার অধীনে কোথাও শিক্ষক তুলনামূলকভাবে বাড়তি। আবার কোথাও এর তীব্র সংকট বিরাজ করছে।
ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন জুলি বলেন, তাদের বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষককে ২৮৪ শিক্ষার্থীর পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হয়। সমন্বিত বদলি চালু হলে শিক্ষকস্বল্পতা ও আধিক্য থাকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সবাই।
শ্রীমঙ্গলের খেজুরিছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই। প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব জানান, ৪০৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। ফলে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে তাঁদের পাঠদান করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, কম শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকায় শিক্ষক-সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকে। শিক্ষকদের মতে, আগে থেকে থাকা সমন্বিত বদলিব্যবস্থা কার্যকর থাকলে এসব বিদ্যালয় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক এনে সংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোয় সমন্বয় করা যেত। বর্তমান ব্যবস্থায় সে সুযোগ স্পষ্ট নয়।
সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে পাঁচজন শিক্ষক থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলির সীমাবদ্ধতা। সরকারের একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রায় এক হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা পাঁচটি করে নির্ধারিত। ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে আটকে থাকার আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জাকির হোসেন বলেন, শ্রীমঙ্গলসহ চা বাগান এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক থাকলেও প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ফলে সহকারী শিক্ষকরাও বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্তত একজন সহকারী শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নীতিমালায় স্পষ্ট করা উচিত।
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, সমন্বিত বদলি চালু হলে শিক্ষক সংকট কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও সুফল পাবে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। বদলির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে উপজেলা কমিটি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী জানান, পাঁচজন শিক্ষক থাকলেও প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে এবং স্থানীয় বদলি কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। পাশাপাশি প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষক পদায়ন করা হলে এই সংকট অনেকটা কমে যাবে।
শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়–এক বিদ্যালয়ে ২৮৪ শিক্ষার্থীর জন্য চারজন শিক্ষক, আর অন্য বিদ্যালয়ে ৭০-এর কম শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচজন শিক্ষক থাকলে, কেবল বদলির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে শিক্ষক বণ্টনের এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তারা আরও গভীরভাবে বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
শিক্ষকদের জোরালো দাবি, নতুন শিক্ষক পদায়নের পাশাপাশি অবিলম্বে সমন্বিত বদলিব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচজন শিক্ষক থাকা বিদ্যালয়, শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ
এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে
হবে। তবেই বদলির ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে এবং সংকটপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও পাবে তাদের প্রাপ্য শিক্ষাসেবা।
- বিষয় :
- বিদ্যালয়