সংকটের জন্য দায়ী বিগত দিনের ভুল নীতি, বলছে সরকারি দল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে উচ্চ পর্যায়ের সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। অন্যদিকে সরকারি দল বলছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিগত দিনের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গতকাল সোমবার সংসদের বৈঠকে জ্বালানি সংকট উত্তরণে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত এই প্রস্তাবে বলা হয়, ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ সম্পর্কে আলোচনা হওয়া দরকার। দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের পাঁচজন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। এ জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর জ্বালানি সেল করা দরকার। বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইলে কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের আশ্বাসের তারা বাস্তবায়ন দেখছেন না। মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হবে না– এমন আশ্বাসের পরও নেওয়া হচ্ছে। ভূতুড়ে বিলের কোনো সমাধান হয়নি। জবাবদিহির জায়গাটা স্বচ্ছ করতে না পারলে প্ল্যান যতই বড় হোক, সবই ব্যর্থ হবে।
তিনি বলেন, সংসদে বলা হয়েছে– আগের সরকার পোষ্যদের লালন করতে অনেক সুযোগ করে দিয়েছিল। নতুন করে আর কোনো পোষ্যদের হাতে পড়তে চাই না। দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে না এলে জাতি কোনোদিন স্বস্তি পাবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে বসে নীতি তৈরি করে নিজেরাই তা লঙ্ঘন করছি। অতীতকে দোষারোপ না করে তার সমাধানে না গেলে তো হবে না। নতুন করে এ ধরনের আরও দুষ্টচক্র তৈরি হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি অর্থ খরচ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সরকারি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আসে; সেই বিষয়গুলো জড়িয়ে যাচ্ছে।
সরকারি দলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এই সংসদে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নিজে আর নিজের ভাই-ভাতিজা নয়; যা করব জাতির জন্য। এটি শুধু উদাহরণ তৈরি করবে না; আগামীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশংসার প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চে তেলের সংকট টেনে আনা হয়েছে। আসলে তেলের সংকট হবে না, যদি মুখের তেলটা বন্ধ হয়। না হলে অসংখ্য জায়গায় সংকট হবে। তিনি বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময় সবাই মিলে বলত– নেত্রী একমত পূত-পবিত্র। বাকি আশপাশের লোকেরা সমস্যা।’
লংমার্চের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের অনেকে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায় না–এটাই বাস্তবতা।
এদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি বলেন, বিগত দিনের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে আগামী বছর বর্তমান সময়ের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে পরিস্থিতির আরও উন্নতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। তিনি বিরোধী দলের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে, যার মেয়াদ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। একই সঙ্গে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খনন চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি বছর অন্তত দুটি নতুন এফএসআরইউর চুক্তি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ রামপাল কেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দ্রুত চালুর আশা করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পাঁচটি কেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ছয় মাসে রুফটপ সোলার স্থাপনে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫৫ পয়সায় কেনার সুযোগ রাখছে। মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও উইন্ডমিল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের টাইকুনগুলোকে পোষার জন্যই এটি করা হয়েছে। দেশের অনশোর ও অফশোরে কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করবে না। এখন যে ভোগান্তি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, সেটি বর্তমান সরকার সৃষ্টি করেনি। এই ভোগান্তি বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা সৃষ্টি করে গেছে বিগত ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা। গত ১৭ বছরের জঞ্জাল এই সমস্যা তৈরি করে গেছে। জ্বালানির কোনো ব্যবস্থা না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেছে।
আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল বিষয়ে বিরোধী দলের দাবির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি বেশি মূল্যের। জাতির পয়সা নষ্ট করে কিছু বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে সীমান্তের ওপাশ থেকে। রাতারাতি কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা যায় না। এটি বন্ধ করা হলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এটি বন্ধ করতে গেলে আরও ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পাব না। রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক সময় ধৈর্যসহকারে যেতে হয়।’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল কতিপয় পোষ্য ব্যক্তির সুবিধার জন্য। এ জন্য দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়নি।
জামায়াতে ইসলামীর নাজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানি-বিদ্যুতের সমস্যা সংকটের জন্য নয়; সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জকে চাঁদাবাজি আখ্যায়িত করে তা বন্ধের দাবি তোলেন তিনি।
- বিষয় :
- সংকট