এক যুগেও আইনি লড়াই শেষ হয়নি
ইশতিয়াক হোসেন জনি
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রথম মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া ১২ বছরেও শেষ হয়নি। ছয় বছর আগে নিম্ন আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করলেও উভয়পক্ষের আপিলের কারণে শেষ হয়নি আইনি লড়াই। ফলে আদালত নির্দেশিত ক্ষতিপূরণের অর্থ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। এদিকে খালাস পাওয়া পুলিশের সোর্স রাসেল মামলার বাদীকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর পল্লবীতে পুলিশ হেফাজতে ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যার ঘটনায় করা এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষকে সহায়তা করছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংস্থাটির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবাল সমকালকে বলেন, ‘মামলাটি এখন আপিল বিভাগে রয়েছে। আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। আবার রাসেল নামে আসামির খালাস পাওয়ার ঘটনায় আমরাও আপিল করেছি। দ্রুতই উভয়পক্ষের আপিলের শুনানি শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পল্লবী-১১ নম্বর সেকশনের ইরানি ক্যাম্পে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে গাড়িচালক জনি ও তাঁর ভাই রকিকে আটক করে পুলিশ। তাদের পল্লবী থানায় নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। পরদিন জনির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রকি ওই বছরের ৭ আগস্ট মামলা করেন। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন প্রতিবেদন জমা দেন। ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা এ মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তারা হলেন–পল্লবী থানার তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমান জাহিদ, এএসআই রাশেদুল হাসান ও কামরুজ্জামান মিন্টু, পুলিশের সোর্স সুমন ও রাসেল।
২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস মামলার রায় দেন। এতে তিন পুলিশ কর্মকর্তার যাবজ্জীবন এবং দুই সোর্সকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে দণ্ডিত প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ভুক্তভোগীর পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। তবে আসামিপক্ষ আপিল করে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে গত বছরের আগস্টে আপিলের রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। তাতে সাবেক এসআই জাহিদুর রহমান ও এএসআই মো. কামরুজ্জামানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। আরেক আসামি এএসআই রাশেদুল হাসানের যাবজ্জীবন দণ্ড কমিয়ে ১০ বছর এবং সোর্স রাসেলকে সাত বছরের সাজা থেকে খালাস দেওয়া হয়।
নিহতের ছোট ভাই ও মামলার বাদী ইমতিয়াজ হোসেন রকি সমকালকে বলেন, ‘নিম্ন আদালতের রায়ের পর ছয় বছরেও বিচারিক প্রক্রিয়ার ধাপগুলো শেষ হয়নি। এ কারণে আদালতের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ এখনও পায়নি জনির দুই সন্তান। দণ্ডিত সাবেক দুই পুলিশ সদস্য কারাগারে থাকলেও এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু পলাতক। সোর্স রাসেল গ্রেপ্তার হলেও পরে খালাস পেয়েছেন। তিনি নানাভাবে আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে বাড়িতেও গিয়েছিলেন। এর সিসিটিভি ফুটেজ আছে। তিনি আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েও ভাঙচুর করেছেন। সেই ঘটনায় করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়েছে। তিনি অস্ত্র রেখে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টাও করেছেন। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি বুঝতে পেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাকে ছেড়ে দেয়। তাঁর কারণে পরিবার নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। তাঁকে খালাস দেওয়ার বিরুদ্ধে এজন্য আপিল করা হয়েছে। এই মামলার আরেক আসামি সোর্স সুমন এর মধ্যে সাজা শেষ করে মুক্ত হয়েছেন।’
আইনজীবীরা জানান, রাসেলকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলেন বিচারক। রায়ে তিনি বলেছিলেন, হেফাজতে (মৃত্যু) নিবারণ আইনে মূলত তাদের বিচারের সুযোগ রয়েছে, যারা হেফাজতে নিতে পারেন। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথা বলা হয়েছে। তবে রাসেল বাহিনীর কেউ নন।
এদিকে ছেলে হারানোর শোকে অনেক বছর ধরেই শয্যাশায়ী জনির মা খুরশিদা বেগম। বয়সের চেয়ে যেন একটু বেশিই বুড়িয়ে গেছেন তিনি। সারাবছর শ্বাসকষ্টসহ নানারকম রোগে ভুগে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন তাঁর একটাই চিন্তা– বুকের ধনকে যারা নির্মমভাবে মেরেছে, তাদের সাজা দেখে যেতে পারবেন তো? প্রায়ই তিনি ছোট ছেলে রকির কাছে জানতে চান, বড় ছেলে জনি হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার কী অবস্থা? জবাবে রকি প্রতিবারই জানান, কিছুদিনের মধ্যে শেষ হবে বিচারপর্ব।
- বিষয় :
- আইনি সহায়তা