নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়তে দৃশ্যমান কর্মসূচি নেই
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘এই কাগজে কী লেখা আছে, একটু পড়ে দেন তো।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ফার্মেসি থেকে কেনা ওষুধের প্যাকেটটি হাতে নিয়ে দোকানির দিকে তাকিয়ে এ কথা বললেন ৪৫ বছর বয়সী রহিমা বেগম। কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা রহিমা নিজের নাম লিখতে পারেন না। মোবাইলে আসা বার্তাও পড়তে পারেন না। সন্তানের স্কুল থেকে কোনো নোটিশ এলে সেটিও পড়ে শোনাতে হয় সন্তানকে।
রহিমার মতো নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা দেশে প্রায় পৌনে চার কোটি। দেশের প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ পড়তে, লিখতে কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার লক্ষ্য থাকলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ এখনও অনেকটা অস্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে আজ ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ এখনও নিরক্ষর। সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের হিসাবে নিরক্ষর মানুষ প্রায় পৌনে চার কোটি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্যে এ সংখ্যাই উঠে এসেছে।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিক্ষার সুযোগের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে তারা শিক্ষার মূলধারার বাইরে। তবে এসব মানুষের কতজন কোথায় আছেন, তাদের বয়স কত, কী কাজ করেন এবং তাদের সাক্ষরতার জন্য কী ধরনের কর্মসূচি প্রয়োজন– এর হালনাগাদ চিত্র স্পষ্ট নয়।
লক্ষ্য ২০৩০, কিন্তু কার্যক্রম সীমিত
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও সাক্ষরতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, লক্ষ্য নির্ধারণের তুলনায় মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম অনেকটাই দুর্বল। গত দুই-তিন বছরে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর দৃশ্যমান কার্যক্রমও সীমিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রথমেই প্রয়োজন দেশের নিরক্ষর মানুষের পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তালিকা। শুধু জাতীয় পর্যায়ে সাক্ষরতার হার প্রকাশ করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। কোন ইউনিয়নে কতজন নিরক্ষর; তাদের বয়স, লিঙ্গ, পেশা ও আর্থসামাজিক অবস্থা কী– এসব তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি নিতে হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, নিরক্ষর মানুষের নির্ভরশীলতা শুধু শিক্ষার ঘাটতি নয়; এটি নাগরিক সক্ষমতারও ঘাটতি। একজন মানুষ যদি রাষ্ট্রের দেওয়া তথ্য নিজে পড়তে না পারেন, তাহলে তাঁর অধিকার, দায়িত্ব ও সরকারি সেবা পাওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি রয়েছে। তবে এখনও প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ নিরক্ষর। এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, নিরক্ষর মানুষের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর এলাকাভেদে বড় ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০৩১ সালে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু, ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অনগ্রসর প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত সাক্ষর ও দক্ষ করে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি চলছে। প্রথম ধাপে নিবন্ধিত চার হাজার ৩১২ জন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর মধ্যে চার হাজার ১৯৮ জন জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন হাজার ৮৮২ জন চাকরি, শিক্ষানবিশ বা উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক (পরিকল্পনা, মনিটরিং ও মূল্যায়ন) ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, ২০৩১ সাল নাগাদ সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
দরকার ‘সাক্ষরতা অভিযান’
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, নিরক্ষরতা দূরীকরণকে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের কর্মসূচি কিংবা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি ‘সাক্ষরতা অভিযান’।
তিনি মনে করেন, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক নিরক্ষর মানুষের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। কর্মজীবী মানুষের জন্য রাত বা ছুটির দিনের শিক্ষা কার্যক্রম, নারীদের জন্য বাড়ির কাছাকাছি কেন্দ্র এবং ঝরে পড়া শিশুদের জন্য নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
- বিষয় :
- শিক্ষা