ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পারমাণবিক জ্বালানি ও নিরাপত্তায়  সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র

পারমাণবিক জ্বালানি ও নিরাপত্তায়  সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার পুরোনো কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই নতুন কাঠামোর আওতায় ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর), আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হয় ১৯৮১ সালে। ১৯৯১ সালে সেটি নবায়ন করা হলেও পরে আর মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর এখন নতুন একটি সমঝোতার মাধ্যমে সহযোগিতার কাঠামো ফের চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি দেশটির অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারার আওতায় হওয়ায় এগুলো সাধারণত ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বর্তমানে ২৬টি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে, যা অন্তত ৫০টি দেশের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আওতা তৈরি করেছে।
গত ৩০ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর ঢাকা আসেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার কাঠামো ফের চালুর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সে সময় পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো দেশের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক সহযোগিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের আগে এমন সহযোগিতা ছিল। তাঁর মতে, এ ধরনের সহযোগিতামূলক চুক্তি দেশের পারমাণবিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করে।

রাশিয়া-ভারতের সহযোগিতা
বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে রাশিয়ার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এই প্রকল্প ঘিরে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা চুক্তি হয়। একই সময়ে দুই দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিষয়ে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও করা হয়।
এরপর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন অসংবেদনশীল কাজে ভারতীয় কোম্পানির অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের  সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভারতের সহযোগিতা রয়েছে।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। দ্বিতীয় কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

নতুন প্রযুক্তি
চলতি পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশাপাশি এখন ক্ষুদ্র মডুলার পারমাণবিক চুল্লি (এসএমআর) ও উন্নত প্রযুক্তির চুল্লি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এসএমআরসহ আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বৃহত্তর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়েছে।
গত ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। দুই পক্ষ আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং এসএমআরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে পারস্পরিক সহযোগিতায় একমত হয়।
এর আগে গত জুন মাসে মস্কোয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিহাচেভের এক বৈঠকে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এসএমআর নিয়ে আগ্রহ দেখালে রোসাটম বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউনিটের প্রস্তাব দেয়।

নিরাপত্তা, জ্বালানি ও নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত এমওইউতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পারমাণবিক চিকিৎসা, কৃষি, পুষ্টি, খনিজ সম্পদ, পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবেষণায় পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
পারমাণবিক গবেষণা চুল্লির উন্নয়ন, পরিচালনা ও ব্যবহার এবং বিভিন্ন আইসোটোপের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক-কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতায় বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বাধীনভাবে তদারকের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি ও উপকরণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন এই চুক্তির প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি বা উপকরণ সংগ্রহে ভবিষ্যতে বিধিনিষেধ আসতে পারে।

চূড়ান্ত হয়নি সমঝোতা
প্রস্তাবিত মার্কিন এমওইউ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গত ৯ আগস্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় খসড়াটি নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পররাষ্ট্র, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন।
খসড়ায় বলা হয়েছে, বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ তৈরি করতে পারে এই উদ্যোগ।
প্রস্তাবিত এমওইউ স্বাক্ষরের পর পাঁচ বছর কার্যকর থাকবে। তবে এটি দুই দেশের জন্য সরাসরি কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে না; এর আওতায় সব কার্যক্রম নিজ নিজ আইন, বিধিবিধান ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের শর্ত মেনেই পরিচালিত হবে। সমঝোতার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ও নথি তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে।
 

আরও পড়ুন

×