ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৌলতপুরে বন্যার পানি বাড়ছেই, পানিবন্দি ৫০ হাজারের বেশি মানুষ

দৌলতপুরে বন্যার পানি বাড়ছেই, পানিবন্দি ৫০ হাজারের বেশি মানুষ
×

বন্যার পানিতে স্কুলে ঢুকে পড়েছে। ছবি: সমকাল

আহমেদ রাজু, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৫ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৭

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। পদ্মার পানি বাড়ছে তো বাড়ছেই। দ্রুত বাড়তে থাকা বন্যার পানি গ্রাস করছে নতুন নতুন এলাকা। উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে বসতবাড়ির আশপাশে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের আশঙ্কা। একই সঙ্গে পানিতে তলিয়ে গেছে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় দুর্গত মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক শূন্য ২ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৮৮ মিটার। ফলে মাত্র ১৮ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার।

অন্যদিকে, উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও দ্রুত বাড়ছে পানি। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৬২ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে পানি। পাউবো জানিয়েছে, ভাগজত পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির এই গতি অব্যাহত থাকলে দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পানির নিচে রাস্তাঘাট, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মানুষ। স্থানীয়রা জানান, দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

পানিতে ডুবেছে ফসলের মাঠ

বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।

পাঠদান স্থগিত ১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে

বন্যার পানিতে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের আপাতত বিদ্যালয়ে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।

বন্যার সঙ্গে নদীভাঙনের আতঙ্ক

পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পানি বেড়ে ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।

চিলমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট তীব্র হতে পারে। দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।

দুই-এক দিনের মধ্যে পানি কমার আশা

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তবে পানি কমার অপেক্ষায় থাকলেও বর্তমানে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং বাড়ছে মানুষের নিরাপত্তা, খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশু রক্ষার উদ্বেগ।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, দৌলতপুরের দুটি ইউনিয়নের মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। এসব মানুষের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে যা যা করার প্রয়োজন, তা করা হবে।

আরও পড়ুন

×