দৌলতপুরে বন্যার পানিতে ৩৫০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি
১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান স্থগিত
ছবি- সমকাল
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৬
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই।
বন্যার পানি বসতবাড়ির আশপাশে ঢুকে পড়ায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মানুষ। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের আশঙ্কা। একই সঙ্গে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ০২ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৮৮ মিটার। ১৮ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার।
উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও পানি দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে পানি। পাউবো জানিয়েছে, এ পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। এই গতি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
পানির নিচে রাস্তাঘাট, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ
বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। স্থানীয়রা জানান, দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ তলিয়ে গেছে। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
পানিতে ডুবেছে ফসলের মাঠ
ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান স্থগিত
বন্যার পানিতে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।
বন্যার সঙ্গে নদীভাঙনের আতঙ্ক
পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পানি বেড়ে ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
দুই-এক দিনের মধ্যে পানি কমার আশা
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়ছে। তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দী মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, দৌলতপুরের দুটি ইউনিয়নের মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। এসব মানুষের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে যা যা করার প্রয়োজন, তা করা হবে।