ঠিকাদারের গাফিলতি, এলাকাবাসীর দুর্ভোগ
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর পাশে ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পারাপার। গত মঙ্গলবার তোলা সমকাল
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ ১৮ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পেরিয়ে গেছে চার বছর। ভোগন্তিতে রয়েছেন কয়েকটি গ্রামের ১২-১৫ হাজার মানুষ। ধানশাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সিদ্দিক আলীর মন্তব্য উঠে এসেছে দুর্ভোগের চিত্র। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ডেলিভারি রোগী হাসপাতালে নিবার আগেই বাচ্চা হয়ে যায়। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া যায় না। গ্রামে কেউ বিয়ে করতেও চায় না।’
জানা গেছে, আগের ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ের পরও সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারায় দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে প্রাক্কলন তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে চার বছর ধরে এলাকার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সেতুটি নির্মাণে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হবে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর ও ধানশাইল ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে সোমেশ্বরী নদীর একটি ক্ষীণধারা। এটি স্থানীয়দের কাছে পাগলা নদী নামে পরিচিত। ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের কালিনগরের এলাকার আমির আলীর বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে ধানশাইল ইউনিয়নের সাজু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত নদীর ওপর দিয়ে কয়েক গ্রামের মানুষ যাতায়াত করেন। বর্ষাকালে সরু এই নদী পারাপারে ভরসা নৌকা। শুকনো মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন নদীর দুই দিকের পাঁচ-সাতটি গ্রামের লোকজন একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হয়ে থাকেন। দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় লোকজন দীর্ঘদিন ধরে সেখানে একটি সেতু নির্মাণের দাবি করছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে সেখানে একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পাঁচ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে ওই সেতুর কাজ শুরু হলেও শেষ হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ১১ জুন। ১৫ মাস আগেই সেই মেয়াদ শেষ। এই সময়ে সেতুটির কেবল পাইল ও এক অংশের অ্যাবার্টমেন্ট তৈরি হয়েছে।
ঝিনাইগাতী এলজিইডি অফিসের তথ্যমতে, প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস (এসইউপিআরবি) প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংক (আইডিএ)। ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর পাঁচ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির নির্মাণকাজ পায় শেরপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ধ্রুব ট্রেড এজেন্সি। ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১১ জুন পর্যন্ত সেতু নির্মাণের সময়সীমা নির্ধারণ হয়। এই সময়ে সেতুর পিলার ও এক অংশের অ্যাবার্টমেন্ট তৈরি করে কাজ বন্ধ করে দেন ঠিকাদার। এরপর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ালেও সেতুটির নির্মাণ কাজ আর শুরু হয়নি। কয়েকবার নোটিশ দেওয়ার পর কাজ শুরু না হওয়ায় দরপত্রটি বাতিল করে এলজিইডি। ঠিকাদার তাঁর কাজের ২০ শতাংশ বিল এলজিইডি কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছেন।
সেতুর সামনে গিয়ে দেখা যায়, দুই পারের কয়েক হাজার কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রায় তিন বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় লোহার রডগুলোতে মরিচা পড়েছে। এক অংশের অ্যাবার্টমেন্ট শ্যাওলা ধরে নষ্ট হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় দক্ষিণ দারিয়ারপাড় সবজি চাষি সুলতান মিয়া ও মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে। তারা জানান, শুকনো মৌসুমে গ্রাম থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে নদীর একপাশে সাজুর বাড়ির কাছে সবজি নিয়ে আসা হয়। পরে সবজির খাঁচা অথবা বস্তা মাথায় করে নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে আমির আলীর বাড়ির পাশে নামানো হয়। সেখান থেকে পিকআপ অথবা ট্রাকে করে সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এভাবে সবজি পরিবহনে তাদের অনেক কষ্ট হয়।
বাগেরভিটা গ্রামের কৃষক নুরুজ্জামান ও মোহনগঞ্জের নূর আলী জানান, এক মণ সবজি পারাপার করতে ৭০-৮০ টাকা ব্যয় হয়। শসা, আলু, কুমড়ো, লাউ, বরবটি পার করা যায়। কিন্তু চিচিঙ্গা পার করতে হলে কান্না আসে। কারণ চিচিঙ্গা ভেঙে গেলে সেটা আর নিতে চায় না পাইকার।
উত্তর কান্দুলি গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেন আলীর ভাষ্য– দক্ষিণ দারিয়ারপাড়, উত্তর কান্দুলি, মাঝাপাড়া, বাগেরভিটা, বেপারীপাড়া মোহনগঞ্জ বাজারসহ আশপাশের ১০-১২ গ্রামের মানুষের ভোগান্তি কেউ না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। এসব এলাকার মানুষ সবজি ও ফসল বিক্রি করে সংসার চালায়। তাদের দুর্ভোগ জনপ্রতিনিধিসহ কারও চোখে পড়ে না।
কৃষক শাজাহান মিয়া বলেন, এই অঞ্চলের মানুষ খুব গরিব। ফসল চাষ করে সংসার চলে। কিন্তু একটি সেতু ও ভাঙা রাস্তার জন্য ন্যয্যমূল্য পাওয়া যায় না। যানবাহনের সুবিধা না থাকায় এক বস্তা সার তিন ভাগে মাথায় করে বাড়িতে নিতে হয়।
শিশু শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পারাপার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। গত মঙ্গলবার সকালে উত্তর কান্দুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আল-আমিনের দাদি জ্বরে আক্রান্ত হন। দাদির জন্য ওষুধ কিনতে সাঁকো পর হচ্ছিল সে। এ সময় সাঁকোর নিচে পানিতে পড়ে যায় আল-আমিন। আলাপকালে সে বলে, ‘দাদির ওষুধের জন্য তাড়াতাড়ি সাঁকো পাড় হতে গিয়ে নিচে পড়ে গেছি। ব্যথা পেয়েছি। আমার মতো অনেক ছেলে-মেয়ে প্রায়ই সাঁকো থেকে নিচে পড়ে যায়।’
ঝিনাইগাতীর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফারহানা পারভীন চলতি সপ্তাহেই পার্শ্ববর্তী শ্রীবরদী উপজেলায় বদলি হয়েছেন। তিনি জানান, ওই সেতুর জন্য দক্ষিণ দারিয়ারপাড় ও উত্তর কান্দুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে উজানের ঢলে পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। তখন তারা বিদ্যালয়ে আসে না। শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে আসা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অভিভাবকরা তাদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না।
ধানশাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতু ও সংযোগ সড়ক হলে হাজারো কৃষিজীবী মানুষ তাদের ফসলের ন্যায্যমূল পাবে। এ ছাড়া ঝিনাইগাতী থেকে শ্রীবরদীর ভটপুর-তাতীহাটি হয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী পর্যন্ত যাতায়াতের পথ প্রশস্ত হবে।
এলজিইডির ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রকৌশলী অনতু বলের ভাষ্য– ঠিকাদার সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারায় দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। ঠিকাদার ২০ শতাংশ কাজ করে বিল দাখিল করেছেন। এখনও বিল পাননি। তিনি বলেন, নতুন করে প্রাক্কলন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হবে।
- বিষয় :
- সেতু