ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বরেন্দ্র অঞ্চলে সূর্যের আলোয় সেচ

বরেন্দ্র অঞ্চলে সূর্যের আলোয় সেচ
×
×

রাজশাহীর মোহনপুরে সৌর প্যানেলের আশপাশে সোনালি ফসলের ঝিলিক। এখানে সৌরশক্তিতে সেচ পরিচালিত হয়। সম্প্রতি তোলা - সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৫ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল গড়িয়ে বাড়ছে রোদের তেজ। সেই রোদেই প্রাণ পাচ্ছে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৌর প্যানেল। মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে পানি। পাইপ দিয়ে সেই পানি ছড়িয়ে পড়ছে পাশের ক্ষেতে। রাজশাহীর মোহনপুরের একটি ফসলের মাঠের দৃশ্য এটি। একসময় যেখানে পানির অভাবে জমি পড়ে থাকত; এখন সেখানে ধান, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচসহ নানা ফসলের চাষ হচ্ছে। কোনো কোনো জমিতে বছরে তিনবারও ধান হচ্ছে।

কৃষকরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা কিংবা ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে যেসব জমিতে সেচ দেওয়া কঠিন ছিল, সেখানে এখন দিনের আলোতেই বিনা জ্বালানি খরচে পানি তোলা যাচ্ছে।

মোহনপুরের কৃষক আনারুল বলেন, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে দূরের পুকুর থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে সেচ দিতে হতো। এতে খরচ বেড়ে যেত। কাছাকাছি নওগাঁ পল্লী বিদ্যুতের লাইন থাকলেও সেচের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না। এখন আর সেই সমস্যা নেই। রোদ থাকলে পাম্প চলে, পানি ওঠে। এই পাম্প দিয়ে প্রায় ২০ কৃষকের ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। কোনো খরচ নেই। বিদ্যুতের লাইনও নেই।

পাম্পটি অবশ্য কোনো একক কৃষকের নয়। স্থানীয় ২০ কৃষককে নিয়ে গঠিত একটি কমিটি এটি পরিচালনা করে। কৃষক সুমন বলেন, আগে এই এলাকায় মূলত বৃষ্টিনির্ভর আমন ধান ও শীতকালীন সবজি-ডালজাতীয় ফসল হতো। সেচের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এখন আমনের পাশাপাশি আউশ ও বোরো ধানও হচ্ছে। কেউ কেউ আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটো চাষ করছেন।
সৌর প্যানেলের পাশের জমিতে ধান কাটছিলেন ফয়েজ উদ্দীন, জাহাঙ্গীর হোসেন, খয়ের উদ্দীনসহ কয়েকজন শ্রমিক। ফয়েজ উদ্দীন বলেন, আগে পানি সংকটে কৃষকরা ধান আবাদ করতে পারতেন না। এখন সৌর পাম্প চালু হওয়ায় সেই সংকট অনেকটাই কেটে গেছে।

পাশের জমিতে স্ত্রীকে নিয়ে বেগুন তুলছিলেন কৃষক আক্তার হোসেন। গাছে ঝুলছিল সারি সারি বেগুন। তিনি বলেন, এখন বেগুন, করলাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করছেন। পাশের জমিতে নিজের খরচে পলিথিন দিয়ে মালচিং করে ফুলকপির চারাও তৈরি করছেন। আক্তার হোসেন বলেন, পানি পাওয়ায় মৃত আর পতিত জমিগুলো এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরের অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সেচ সংকট রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের সেচের আওতাও অনেক জায়গায় কমে গেছে। ফলে কোথাও কোথাও বছরে এক বা দুটির বেশি ফসল ফলানো সম্ভব হতো না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এ চিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে। প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের সৌরচালিত সেচব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৪টি ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা, প্রতিটির ক্ষমতা দুই অশ্বশক্তি। নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়ার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া আটটি পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী এক জমি থেকে অন্য জমিতে নেওয়া যায়। এক একর আয়তনের ফল বাগানের জন্য ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, সৌর পাম্পের কারণে বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই কৃষকরা দিনের বেলায় সেচ দিতে পারছেন। এতে সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক গভীর নলকূপ আগের মতো সেচ দিতে পারছে না। ফলে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। সৌর পাম্প স্থাপনের পর এসব জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ হচ্ছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, একটি সৌর সেচ পাম্প স্থাপনে দরপত্র অনুযায়ী প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিটি ব্যবস্থায় ৫৫০ ওয়াট ক্ষমতার ছয়টি প্যানেল রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার ২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। পাম্পটির ক্ষমতা দুই অশ্বশক্তি। একটি পাম্প দিয়ে ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সাধারণত সেচ দেওয়া যায়। রোদের তীব্রতা কম থাকলে পানি কিছুটা কম ওঠে। তবে প্রতিদিন সেচ দেওয়ায় মোট চাহিদা পূরণ হয়ে যায় বলে জানান প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ আগের কমান্ড এলাকার পুরোটা ধরে রাখতে পারছে না। এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, একটি গভীর নলকূপ হয়তো ১৫০ বিঘা জমি নিয়ে যাত্রা করল। দুই বছর পর দেখা গেল, ১০০ বা ৮০ বিঘার বেশি সেচ দিতে পারছে না। অনেক জায়গায় ১০০ বিঘা জমির মধ্যেও গভীর নলকূপের সেচ নেই। এই বাস্তবতায় সৌর পাম্পের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রকল্পটি। বর্তমানে চালু থাকা ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পের সঙ্গে সৌরব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, সৌর পাম্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দিনের যে সময়ে সেচের চাহিদা বেশি, সেই সময়েই সূর্যের আলো পাওয়া যায়। তাই এটি কৃষির সেচের সঙ্গে খুব ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রাজশাহীর মোহনপুরের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, মাঠ পর্যায়ে সৌর প্যানেল স্থাপনের ফলে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই এমন এলাকায় এর কার্যকারিতা বেশি। সৌর পাম্পের উৎপাদিত বিদ্যুতের অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা গেলে এর ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে। 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে সৌর সেচের একটি বড় সুবিধা হলো, সেচের প্রয়োজন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় প্রায় একই। দিনের বেলায় যখন কৃষকরা সাধারণত জমিতে পানি দেন, তখনই সূর্যের আলো সবচেয়ে বেশি থাকে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় বছরে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। ফলে সৌরচালিত সেচ শুধু ডিজেলের বিকল্প নয়; ভূগর্ভস্থ পানির দক্ষ ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোরও একটি উপায় হতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের কৃষিতে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী খাতগুলোর একটি সেচ। বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য রবি ফসল উৎপাদনে শুষ্ক মৌসুমে সেচ অপরিহার্য। কিন্তু সেই সেচের বড় অংশ এখনও ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বাড়লে সরাসরি বাড়ে সেচের খরচ। এ কারণে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়। আর শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়ে কৃষক ও ভোক্তার ওপর। সেচে সৌরশক্তির সম্ভাবনা থাকলেও দেশে এর ব্যবহার এখনও সীমিত। বরেন্দ্রের মাঠে সেই সম্ভাবনারই ছোট ছোট উদাহরণ তৈরি হচ্ছে। অফ সিজনে এই সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যেন দ্রুত নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়, সেই নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরও পড়ুন

×