৩০ হাজারে কিনে লাখ টাকায় কিশোরকে বিক্রি
ছবি: সংগৃহীত
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:০৫
নবম শ্রেণির ছাত্র আয়াত উল্লাহ মাসখানেক আগে বেরিয়েছিল কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যাং পাড়ার বাড়ি থেকে। এরপর থেকে খোঁজ মিলছিল না তার। পরিবারে দেখা দেয় উৎকণ্ঠা। স্বজনরা খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারেন, এই কিশোরকে অপহরণ করে মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাকে টেকনাফের মৌচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর জন্য আয়াত উল্লাহকে তুলে দেওয়া হয় ট্রলারে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি সমুদ্র থেকে বিকল ট্রলার থেকে আয়াত উল্লাহসহ ৭৬ জনকে উদ্ধার করে নৌবাহিনীর একটি দল। ততক্ষণে ট্রলারটিতে পানি উঠতে শুরু করেছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই ৭৬ জনের মধ্যে ১১ জনকে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে তাদের আটক করে নৌবাহিনী।
শুক্রবার বাকি ৬৫ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে জব্দ করা ট্রলারসহ টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়। এদের মধ্যে চার নারীসহ ২৪ জন মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত (রোহিঙ্গা) নাগরিক রয়েছেন।
এদিন সকালে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হলে সেখানে কথা হয় আয়াত উল্লাহর সঙ্গে। এক মাসের বন্দিজীবন আর সাগরে মৃত্যুভয়ের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে ওই কিশোর। টেকনাফ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আয়াত উল্লাহ জানায়, ‘বাড়ি থেকে বের হয়ে টার্মিনাল এলাকায় গেলে কয়েকজন আমাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর মৌচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ে নিয়ে জিম্মি করে রাখে। সেখানে আরও অনেক লোক ছিল। তাদেরও আমার মতো ধরে আনা হয়েছিল।’
তার ভাষ্য, প্রথমে তাকে ধরে নিয়ে ৩০ হাজার টাকায় এক দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে ওই দালাল আরও এক লাখ টাকার বিনিময়ে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে। এরপর তাকে প্রায় এক মাস পাহাড়ে আটকে রাখার পর অন্যদের সঙ্গে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া এলাকায় নামিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সাগরে একটি ট্রলারে তুলে দেওয়া হয় সবাইকে।
আয়াত উল্লাহ জানায়, ‘তিন দিন সাগরে চলার পর বোটটি বিকল হয়ে যায়। তখন বোটে পানি ঢুকতে শুরু করে। আমরা খুব ভয় পেয়ে যাই। মনে হচ্ছিল, আর হয়তো প্রাণে ফিরতে পারব না। পরে নৌবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে। আল্লাহর রহমতে আবার জীবন ফিরে পেয়েছি।’
ভাইকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হয়েছিল আয়াতের ভাই মো. সিরাজের। তিনি বলেন, মাসখানেক ধরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আয়াতের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে জানতে পারেন, স্থানীয় এক দালাল তাঁর ভাইকে অপহরণ করে মানব পাচারের দালালের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
এই কিশোরের মতোই অপহরণের পর পাচারের শিকার হতে বসেছিলেন টেকনাফের আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে এনামুল হক কায়েছ, মো. জয়নাল ও ওয়াকিব উল্লাহ। এনামুল হক কায়েছ টেকনাফের হ্নীলা এলাকার একটি বনফুলের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন।
তার বাবা আহমুদুল রহমান জানান, প্রায় ১০ দিন আগে হঠাৎ নিখোঁজ হন কায়েছ। সে প্রতিবন্ধী হলেও পরিবারের একমাত্র আয়-রোজগারের ভরসা ছিল। একদিন দোকানদার ফোন করে জানতে চান, ছেলে বাড়িতে ফিরেছে কিনা। তখন তিনি বুঝতে পারেন, ছেলে নিখোঁজ হয়েছে।
আহমুদুল রহমান বলেন, ‘অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের সন্ধান পাইনি। আজ জানতে পারলাম, সাগর থেকে নৌবাহিনী যাদের উদ্ধার করেছে, তাদের মধ্যে আমার ছেলেও রয়েছে।’
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের অদূরে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী বোটসহ ৭৬ জনকে উদ্ধার করে নৌবাহিনী থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের মধ্যে ১১ জন দালাল। তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করে আদালতে পাঠানো হবে। আর পাচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবেন।’