ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

এক দশকেও ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়নি, নির্ধারিত জায়গায় মাছ চাষ

এক দশকেও ভবন নির্মাণকাজ শুরু  হয়নি, নির্ধারিত জায়গায় মাছ চাষ
×
×

জামালপুর মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতালের জায়গা এখন জলাশয়। হচ্ছে মাছ চাষ- সমকাল

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর  

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৬ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জায়গা নয়, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে চিকিৎসা শেখারও অন্যতম ক্ষেত্র। অথচ জামালপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও শুরুই হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ। হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শুরু না হওয়ায় নির্ধারিত জায়গাটি পরিণত হয়েছে জলাশয়ে। সেখানে চলছে মাছ চাষ। অথচ প্রকল্প মেয়াদ অনুযায়ী গত ২০১৯ সালের জুন মাসেই হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্য সেবা চালু হওয়ার কথা ছিল।

জানা গেছে, নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ করতে হচ্ছে জামালপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। কয়েক কিলোমিটার দূরের জেনারেল হাসপাতালে ওয়ার্ড কার্যক্রম এবং সেখানে ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা। একই সঙ্গে জামালপুর জেলার পাশাপাশি কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা, শেরপুরসহ আশপাশ এলাকার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে জামালপুর শহরের মনিরাজপুরে ৩৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা হয় জামালপুর মেডিকেল কলেজ। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের হোস্টেল, নার্সিং কলেজসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্থাপনা। এই প্রকল্পের আওতায় ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করার কথা ছিল ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের। প্রকল্পের অন্যান্য কাজ প্রায় শেষ হলেও আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ভবন নির্মাণ কাজ। 
বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শনের সময় মেডিক্যাল কলেজ-সংলগ্ন হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে সীমানা প্রাচীর। সেখানে নেই কোনো স্থাপনা। নিচু জায়গাটি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। সেখানে করা হচ্ছে মাছ চাষ। 

জামালপুর মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, ইতোমধ্যে মেডিকেল কলেজের ৭টি ব্যাচ পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হয়ে বেরিয়ে গেছেন। তাদের ইন্টার্নশিপ করতে হয়েছে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে। বর্তমানে অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থীকেও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনও করেছেন তারা। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। 
মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী মারুফ হাসান পান্না বলেন, হাসপাতাল না থাকায় তারা পর্যাপ্ত রোগী, আধুনিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধার মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কয়েক কিলোমিটার দূরে সদর জেনারেল হাসপাতালে ওয়ার্ড কার্যক্রম করতে হয়। এতে একাডেমিক পরিবেশ ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য দ্রুত হাসপাতালটি স্থাপন করা জরুরি বলেও জানান তিনি। 

আরেক শিক্ষার্থী মুমতাহিনা মিম গত ১ অক্টোবর থেকে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ শুরু করেছেন জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে। তিনি বলেন, একটি মেডিকেল কলেজের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হচ্ছে হাসপাতাল। সেখানে যে একাডেমিক পরিবেশ, ল্যাব, প্যাথলজিসহ অন্যান্য বিষয়ে অভিজ্ঞতার সুযোগ পেতেন শিক্ষার্থীরা তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য রোগীই ‘টেক্সটবুক’। রোগীর কাছে গিয়ে হাতে-কলমে চিকিৎসা শেখা মেডিকেল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাদের ওয়ার্ড কার্যক্রম ও ইন্টার্নশিপের বড় অংশই করতে হচ্ছে সদর হাসপাতালে। 
জামালপুর রোগী কল্যাণ কমিটির সহসভাপতি মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি নির্মাণের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হাসপাতাল ভবনের কাজ শুরু হচ্ছে না। এতে একদিকে দুর্ভোগে আছে মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থীরা, অপরদিকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জামালপুর জেলা ও আশপাশের এলাকার মানুষ। জটিল রোগ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেই তাদের যেতে হচ্ছে ময়মনসিংহ বা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

জামালপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ স্থাপনসহ প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শুরু হয়ে ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে পর্যায়ক্রমে কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে বর্তমানে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের অন্যান্য কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হলেও হাসপাতাল স্থাপনের কাজ এখনও শুরু করা যায়নি। হাসপাতাল না থাকায় মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জামালপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ৫০০ শয্যার জামালপুর মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতাল ভবনের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্যাবিনেট ডিভিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×