রংপুরে চার খুন
আলামতের সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ডিএনএ মেলেনি
মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার তদন্তে অগ্রগতি হওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ খেজুর, শসা, সিগারেটের নমুনায় দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন রংপুর সিআইডির এসপি সুমিত চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। হত্যায় জড়িত সন্দেহে তাদের প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পুলিশ জানায়, জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের জবানবন্দির তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। তখন তদন্ত কর্মকর্তা ওসি ডিবি জিনাত আলী জানিয়েছিলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও এর আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চার হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে বিপুলসংখ্যক আলামত সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ল্যাবে। এর মধ্যে ছিল সিগারেটের অংশ, খেজুর, শসা, ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, বেসিনের দাগসহ অন্তত ৩৫টি আলামত। এসব আলামতের একটি অংশ ঢাকার সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ডিএনএ নমুনাও পাঠানো হয় ঢাকায়। তখন তদন্ত কর্মকর্তা ওসি ডিবি জিনাত আলী জানিয়েছিলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা আরও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হবে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, হত্যাকাণ্ডের পরও মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ কিছু সময় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। তারা গোসল করেন এবং ঘরের ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান। পরে তারা ঘরের বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যান। ঘটনাস্থলে পাওয়া কামড় দেওয়া শসা ও খেজুরের বিচি শুরু থেকেই তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে সিগারেটের অংশসহ অন্যান্য জৈব ও বস্তুগত আলামতও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এই মামলায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
পুলিশ জানায়, ওই জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীরা তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। তদন্তের এই পর্যায়ে ডিএনএ মিলকে এককভাবে চূড়ান্ত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা। আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ ফলাফলের পাশাপাশি জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের অন্যান্য আলামত, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনায় আসবে।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ সমকালকে বলেন, ‘ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধের খুনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললেও এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে শুধু দুজনেই খুনের ঘটনাটি সংঘটিত করেছেন। খুনের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।’
গতকাল শুক্রবার রংপুর মহানগর পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘জব্দ করা আলামতের ডিএনএ পরীক্ষায় তৃতীয় ব্যক্তির কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, হত্যায় ওই দুজনই সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত।’ দুজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা সম্ভব নয়– স্থানীয়দের এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধারণা সঠিক নয়। অন্য কারও জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
- বিষয় :
- খুন