ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সুপেয় পানি প্রকল্পের অধিকাংশ নলকূপে আর্সেনিক-আয়রন

সুপেয় পানি প্রকল্পের অধিকাংশ  নলকূপে আর্সেনিক-আয়রন
×
×

ডিপিএইচই প্রকল্পের আওতায় সাটুরিয়ায় স্থাপন করা একটি গভীর নলকূপ সমকাল

জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে ডিপিএইচই প্রকল্পের আওতায় সাটুরিয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। কিন্তু সুপেয় পানি মিলছে না বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পানির সঙ্গে উঠছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রন। 

সাটুরিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ডিপিএইচই প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ১ হাজার ১৭০টি সাব-মার্সিবল গভীর নলকূপ ও ১৮টি কমিউনিটি বেজড গভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি সাব-মার্সিবল নলকূপের গ্রাহক একজন এবং প্রতিটি কমিউনিটি বেজড নলকূপের গ্রাহক ১০ জন। ২০১৯ সালে এসব গভীর নলকূপ স্থাপন শুরু হয়, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্থাপন শেষ হওয়ার কথা। দুই একটি বাদে প্রায় সবগুলোই স্থাপন শেষ হয়েছে। এগুলো স্থাপন  করেছেন নিবন্ধিত ১০-১২ জন ঠিকাদার।

সূত্রমতে, ১১৭০টি গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং ১৮টি কমিউনিটি বেজড গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রায় ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে এই প্রকল্পের সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ৬০ শতাংশ উপকারভোগী। অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, উপজেলায় স্থাপন করা অধিকাংশ নলকূপের পানি পরীক্ষা করে আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ০ দশমিক ৫ পিপিএম/লিটার। কিন্তু সাটুরিয়ার ডিপিএইচই প্রকল্পের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ নলকূপের পানিতে ০ দশমিক ৬ থেকে ০ দশমিক ৮ মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। যেসব নলকূপে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়া গেছে, সেসব নলকূপের পানি ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা হয়েছে। অবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেককে ফিল্টার দেওয়া হয়েছে। তবে অনেকেই ফিল্টার ব্যবহার করতে না পারায় বিষযুক্ত পানিই পান করছেন।
ডিপিএইচই প্রকল্পের উপকারভোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, আগে ৭০ থেকে ২০০ ফুট অগভীর নলকূপে অনেক ভালো মানের পানি পাওয়া গেছে। অথচ প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপে পানির সঙ্গে উঠছে আর্সেনিক ও আয়রন। উপকারভোগী শামীমা আক্তার বলেন, এই গভীর নলকূপের পানি দিয়ে গোসল বা কাপড় ধৌত করলে জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। সাদা কাপড় হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

সুপেয় পানি পাওয়ার আশায় সাটুরিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গভীর নলকূপ নিয়ে ছিলেন দরগ্রাম ইউনিয়নের আলিনূর বকস রতন। নলকূপটি থেকে ১০টি পরিবার সুপেয় পানি পান করার কথা। কিন্তু পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে জানান ভুক্তভোগীরা। নিরুপায় হয়ে আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান করছেন তারা। এসব পরিবারের অভিযোগ, যে পরিমাণ পাইপ স্থাপন করার কথা তা করা হয়নি। 

সাটুরিয়া ইউনিয়নের বৈলতলা গ্রামের আনোয়ার হোসেন পিন্টুও তাঁর গ্রামের ১০টি পরিবারের জন্য একটি কমিউনিটি বেজড গভীর নলকূপ স্থাপন করেন। কিন্তু অতিমাত্রায় হলুদ বর্ণের আয়রন ও আর্সেনিক থাকায় নিরাপদ পানি পাচ্ছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, নিরাপদ পানির আশায় সরকারি কোষাগারে ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে পানি পাচ্ছেন বিষযুক্ত। এই প্রকল্পের আওতায় একটি গভীর নলকূপের জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার ওপর। কিন্তু সাটুরিয়া ইউনিয়নে যেসব গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে তার বেশির ভাগেই আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি। পিন্টুর অভিযোগ, যে নিয়মে নলকূপটি বসানোর কথা ছিল তা মানেননি ঠিকাদার। উল্টো ঠিকাদারের লোকজন খাওয়ার কথা বলে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন।
বালিয়াটি ইউনিয়নের খলিলাবাদ গ্রামের রিপন হোসেন তাঁর বাড়িতে ডিপিএইচই প্রকল্পের একটি সাব-মার্সিবল নলকূপ বসান। নলকূপটি ৫০০ ফুট গভীর পর্যন্ত স্থাপন করার কথা থাকলেও ঠিকাদারের লোকজন ৪০০ ফুট গভীরে যাওয়ার পর বলেন, নিচে পাথর তাই আর নিচে যাওয়া সম্ভব হবে না। এরপর পানি বের হলো হলুদ, যা ব্যবহারের অযোগ্য। পানি নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে গেলে তারা পরীক্ষা করে আর্সেনিক শনাক্ত করেন। কিন্তু এর সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রোকেয়া বেগমের ভাষ্য, আয়রন ও আর্সেনিক মানুষের জীবন শেষ করে দেয়। এই পানি পানে হতে পারে ক্যান্সার, শরীরে উঠতে পারে ফোসকা। বিষযুক্ত পানি পান করলে কিডনি ও লিভারের সমস্যা হতে পারে। আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান করলে পেটের পিড়া হতে পারে। তাঁর দাবি, সাটুরিয়াতে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
নলকূপ স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। সাটুরিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল আজিজুল হাকিম জানান, সাটুরিয়ার বেশির ভাগ ইউনিয়নের ভূগর্ভস্থ পানি ভালো না। শতকরা ৩০ থেকে ৩৫টি গভীর নলকূপে আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সহনীয় মাত্রার বেশি আর্সেনিক পেলে পানি ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, দরপত্র অনুযায়ী কাজ হয়েছে। যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা ঠিকাদারের লোকজন ও বাড়ির মালিকরা সমন্বয় করেই করেছেন বলে জানান তিনি।
 

আরও পড়ুন

×