রাজবাড়ীতে দু-দিনের বাংলা উৎসব শুরু
ভাষার প্রেমে কৈশোরের উচ্ছ্বাস
বাংলা উৎসব উদ্বোধনের আগে বর্ণিল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া শিশু-কিশোরদের একাংশ। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায় সমকাল
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের এক পাশে শোভা পাচ্ছে নানান নামে শিশুদের হাতে তৈরি রঙিন দেয়াল পত্রিকা। শিশু-কিশোররা বর্ণিল সাজে এসেছে বাংলা নিয়ে আয়োজিত নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। এ কারণে উচ্ছ্বাস-আনন্দে মেতে উঠছে তারা। বছরে একবারই হয় এমন আয়োজন।
গতকাল শুক্রবার সকালে এখানে দুই দিনের আয়োজন উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এ সময় তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে মৌলবাদের আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি। এটাকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের সংস্কৃতি মাধ্যমকে জাগিয়ে রাখতে হবে। সংস্কৃতির প্রতিটি মাধ্যমকে সক্রিয় করে তোলা দরকার। সংগীত, নৃত্য, নাটক, আবৃত্তি, যাত্রাপালা সব জায়গায় আমাদের হাত দিতে হবে।’
উৎসবের দশম আয়োজন উপলক্ষে এদিন সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শহর প্রদক্ষিণ করে একই জায়গায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া শিশুদের হাতে ছিল নানা রঙের বিভিন্ন বর্ণ, বেলুন ইত্যাদি।
আয়োজক কমিটি সূত্র জানায়, দুদিন ব্যাপী এ উৎসবে বর্ণ, যুক্তবর্ণ, মাত্রা, কারচিহ্ন, ফলা, শব্দ, বাক্য, বানান সংশোধন, ভুল সংশোধন, শব্দার্থ হাতের সুন্দর লেখা, বর্ণচাল, বর্ণ দিয়ে শব্দ বানাও, চিত্রাঙ্কন, মেধা যাচাই, বিরাম চিহ্ন, উপসর্গ ও অনুসর্গ, বাগধারা, বিপরীত শব্দ, এককথায় প্রকাশ, প্রকৃতি ও প্রত্যয়, কারক ও বিভক্তি, সন্ধি, সমাস, পদ পরিবর্তন অথবা বিপরীত শব্দ, সমার্থক শব্দ, সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ, একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ, বিতর্কসহ ৫০টির বেশি বিষয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে জেলার নানা বিদ্যালয়ের এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। তারা চারটি বিভাগে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বিভাগগুলোর নাম করা হয় রাজবাড়ীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নামে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিভাগের নাম চন্দনা, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভাগের নাম গড়াই, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভাগের নাম কুমার এবং নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় পদ্মা বিভাগে।
শেরে বাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সেমন্তী তরী এসেছিল কুমার বিভাগের প্রতিযোগিতায়। এই কিশোরী জানায়, এসব প্রতিযোগিতা তাদের মেধা বিকাশে সহযোগিতা করে। পুরস্কার নয়, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই তার জন্য বড়।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পূর্ণতা জানায়, গত বছরও বাংলা উৎসবে অংশ নিয়েছিল। অনেক জ্ঞানী, গুণী মানুষ আসেন। তাদের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। এ জন্য বছরজুড়েই তারা এ উৎসবের অপেক্ষায় থাকে।
দেয়াল পত্রিকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছে মেধা ও মননের তীক্ষ্ণতা। নামগুলোও নান্দনিক– ঐতিহ্য আলেখ্য, স্বপ্ননীড়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, শেকড়ের টানে বাংলা, রূপে রসে বাংলা, বাংলা ও বাঙালিয়ানা হারিয়ে যাচ্ছে কি? ইত্যাদি। এসব দেয়াল পত্রিকায় শিশুরা লেখা ও ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজবাড়ী একাডেমির সভাপতি সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অন্যদের মাঝে বক্তব্য দেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এএএনএম মোমেনুজ্জামান, সাংস্কৃতিক অনুরাগী নাসিম শফি, প্রাক্তন অধ্যক্ষ এবিএম মঞ্জুরুল আলম দুলাল, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. ইকবাল হোসেন।
ডা. ইকবাল হোসেনের ভাষ্য, ‘এটি প্রচলিত অর্থে বারোয়ারি যে উৎসব তেমন নয়। এখানে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ৫০টির মতো বিষয় সন্নিবেশিত থাকে। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করা, যা বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে শুরু হলে তাদের জন্য অনেক ভালো হবে।’
সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে বিকশিত করতে হলে আমাদের চর্চা ও পরিচর্যা দুই-ই করতে হবে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষাকে পেয়েছি। এ ভাষাকে আমাদের ভালোবাসতে হবে।’ এ জন্যই তারা বাংলা নিয়ে এ উৎসবের আয়োজন করেন জানিয়ে তারা বলেন, এ উৎসবে ব্যাপক সাড়া পেয়ে তারা অনুপ্রাণিত। এ উদ্যোগ চালিয়ে যেতে চান।
এদিন বিকেলে বাংলা উৎসব স্মারক বক্তৃতা ও গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয় সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সমাজসেবক আজিজা খানমকে।
- বিষয় :
- উৎসব পালন