ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

‘আগে জানলে কোথাও পাঠাতাম না আমার পাখিটারে’

কুমিল্লায় কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা, শোকে স্তব্ধ মা-বাবা

‘আগে জানলে কোথাও পাঠাতাম না আমার পাখিটারে’
×
×

শোকে স্তব্ধ তাজমিনের মা-বাবা

যশোর অফিস

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০০:২৫

‘আগে জানলে কোথাও পাঠাতাম না আমার পাখিটারে। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব। জানোয়ারটা আমার মেয়ের ওপর কী যে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, আল্লাহ! কত কষ্ট পেয়েছে আমার পাখিটা। বাঁচার জন্য ধানক্ষেতে ছুটাছুটি করেছে। তার পরেও বাঁচতে দিল না জানোয়ারটা।’

এভাবেই বিলাপ করছিলেন কেয়া খাতুন। একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) হারানোর শোকের মধ্যে তাঁর ওপর নির্যাতন ও হত্যার খবর যেন আরও বেশি ভেঙে দিয়েছে তাঁকে। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। মেয়েকে হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ বাবা আবদুল আলীমও। স্বজনদের বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলছেন না তাঁরা।

শনিবার যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমিনদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির নিচে কয়েকজন নারীকে ঘিরে এক নারীর হাতে থাকা স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ সবার। সেখানে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া তাজমিনের রক্তাক্ত মরদেহের ছবি। কেউ আঁতকে উঠছেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকছেন। শোক আর আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

কুমিল্লায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের হাতে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে তাজমিনকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এমনই শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারটিতে।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাজমিন স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ার পর পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়া নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করা হয়।

শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে জানান, ঘটনার রাতে তাজমিনের ভাড়া করা অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাজমিন। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয়। রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তাঁরা।

রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে তাজমিনের মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের কাছে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠানো হয়। সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। পরদিন সকালে ওই লোকেশনে গিয়ে তার রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীমের বন্ধু ও স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শিমুল হোসেন বলেন, ‘তাজমিনের বাবা স্বাভাবিক হতে পারেননি। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। তাঁরা কাউকে ওভাবে সন্দেহ করছেন না। কোন বান্ধবীর বাড়িতে গিয়েছিল, সেটাও তাজমিন জানায়নি।’

শিমুল হোসেন আরও বলেন, তাজমিনের বাবা জানিয়েছেন, মেয়ে কক্সবাজার যাবে, তা তিনি জানতেন। যাওয়ার সময় বলেছিল, বান্ধবীর বাসায় যাবে। সেখান থেকে বান্ধবীর সঙ্গে যাবে। কিন্তু এভাবে নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির মুখে পড়বে, তা জানলে নিশ্চয়ই মেয়েকে যেতে দিতেন না। কোন বান্ধবীর সঙ্গে ছিল, সেটিও এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি তিনি।
এদিকে মেয়ের কবর জিয়ারত করে বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছেন আবদুল আলীম। মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর জানার পর থেকে আরও বেশি ভেঙে পড়েছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমিনের আর কোনো ভাইবোন ছিল না। পড়াশোনায় মেধাবী ছিল সে। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকস্তব্ধ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন

×