কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা
ভাঙছে জমি, তারা এখন সর্বস্বান্ত
পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙছে পানের বরজ। গতকাল রোববার কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আরকান্দি গ্রামে। ছবি: সমকাল
আজিজুল হাকিম, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৩৫
পদ্মাঘেঁষে সাত বিঘা জমি ছিল আব্দুল জলিলের। এর পুরোটা জুড়েই ছিল পানের বরজ। এক সপ্তাহের মধ্যে সেই জমি ভাঙতে ভাঙতে নেমেছে মাত্র চার কাঠায়। গত শনিবার এই পানচাষিকে পাওয়া যায় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মাধবপুরে। এই গ্রামেই বাড়ি আব্দুল জলিলের। অধিকাংশ জমি হারিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে সমকালকে তিনি বলেন, ‘এই দুঃখ কাকে বলব?’
আব্দুল জলিলের চেয়েও ভয়াবহ দুর্যোগে পড়েছেন কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত রায়টা গ্রামের নাসিম হোসেন। তিনি বলেন, ‘কয়দিন আগে আমাদের ৪ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা পানের বরজ নদীতে ভেঙে গেছে। আমরা এখন পথের ফকির।’ তাঁর এক ছোট ভাই অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পান চাষ করতেন। বছরখানেক ধরে এই এলাকায় ভাঙন তীব্র হওয়ায় সেই জমিও গেছে। মনের দুঃখে কাউকে না জানিয়ে তিনি দুই মাস আগে বিদেশ চলে গেছেন বলেও জানান নাসিম।
জেলার দৌলতপুর উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা পদ্মার ধারা টানা নেমেছে মরিচা ইউনিয়নের ভুরকা পর্যন্ত। এখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে প্রবাহিত হয়ে ভেড়ামারার রায়টা থেকে বয়ে গেছে পূর্বে। প্রায় ১০ কিলোমিটার যাওয়ার পর বাহাদুরপুর ইউনিয়নেরই কুচিয়ামোড়া গ্রাম থেকে আবার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নেমেছে পদ্মা।
গত এক বছরে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আরকান্দি, মাধবপুর, রায়টা, লিসেনদিয়া গ্রাম ও জুনিয়াদহ ইউনিয়নের কিছু অংশে প্রায় ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এর ৯০ শতাংশ বাহাদুরপুর ইউনিয়নে। এসব জমির অধিকাংশেই পান চাষ হতো, যা পুরো এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল। এই পানই দেশের অন্যতম পুরোনো কুচিয়ামোড়া পানবাজারের প্রধান ভিত্তি।
স্থানীয় চাষিরা বলছেন, বছরখানেক আগে ভাঙন শুরু হয়ে মাস ছয়েক আগে থেমেছিল। কিন্তু দুই মাস আগে আবারও শুরু হয় ভাঙন। নদীর পানি কমতে থাকায় গত সপ্তাহে তা তীব্র হয়েছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় দুই মাসে প্রায় ৫০০ বিঘা ফসলি জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছেই।
গতকাল রোববার সরেজমিন জানা গেছে, পাঁচ দিনের মধ্যে রায়টা গ্রামের ইব্রা মোল্লা আড়াই বিঘা জমিতে গড়ে তোলা পানের বরজ ও লিসেনদিয়ার মগজেল হোসেন দুই বিঘা আয়তনের বরজ নদীতে ধসে পড়েছে। এ ছাড়া রায়টা এলাকার মইনুল প্রামাণিক, নাসিম ও জুয়েল দুই দিনের মধ্যে এক বিঘা করে জমি হারিয়েছেন। এসব জমিতেই পানের বরজ রয়েছে। বরজের বাকি অংশও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান তারা।
কুচিয়ামোড়া এলাকার পানচাষি ও ব্যবসায়ী নেতা আসলাম হোসেনের ভাষ্য, ‘প্রতিদিন ৯-১০ বিঘা করে জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। পাউবো একেবারে নির্বিকার। আমরা গণহারে
আবেদন জানিয়েছিলাম, কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপজেলা প্রশাসন কয়েক দিন আগে ক্ষতিগ্রস্ত ৩২০ জন পানচাষির তালিকা নিয়ে গেছে। এরা গত এক বছরে প্রায় ৩০ হাজার পিলি (প্রতি
বিঘায় ১০০ পিলি) পানবরজ হারিয়েছেন।’ এর ক্ষতিপূরণ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
তাঁর দেওয়া তথ্যের সত্যতা মেলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাহমুদা সুলতানার বক্তব্যেও। তিনি জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩২০ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। তাঁর আশা, শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাউবো কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, ‘ভেড়ামারার ওই অঞ্চলে প্রায় ৫ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন হচ্ছে। এর মধ্যে তিন কিলোমিটার অত্যন্ত গুরুতর, যা জরুরি সহায়তা দিয়ে রোধ করা অসম্ভব। আমরা প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রকল্প পাস হলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নিয়ে কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের তথ্য জানিয়ে ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিরুল আরাফাত বলেন, ভাঙন রোধে তারা পাউবোকে তাগিদ দিয়েছেন। কৃষি অফিসের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষি ও কৃষকের তালিকা তৈরি হয়েছে। জরুরি সাহায্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- কুষ্টিয়া